spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

মা-বাবা ভুল পথে চললে সন্তানের করণীয়

জেড নিউজ , ঢাকা :

মা-বাবা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও আনুগত্য ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

কোরআন বহুবার আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গে মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন মা-বাবা এমন কোনো কাজ করতে বলেন বা এমন কোনো পথে চলেন, যা আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী। তখন একজন সন্তানের করণীয় কী?

ইসলাম এ ক্ষেত্রে যেমন বাবা-মায়ের অবাধ্যতাকে উৎসাহিত করেনি, তেমনি তাঁদের ভুল বা অন্যায় অনুসরণ করতেও বলেনি। বরং ইসলাম অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ একটি পথ দেখিয়েছে— তা হলো, বাবা-মায়ের ভুলের কারণে সন্তান যেন নিজে ভুল পথে না যায়; আবার তাঁদের ভুলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যেন তাঁদের অসম্মানও না করে।

এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে পীড়াপীড়ি করে, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৫)

আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি শিক্ষা দেয়।

বাবা-মা যদি আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করেন, তাহলে সেই নির্দেশ পালন করা যাবে না। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা, দুর্ব্যবহার করা কিংবা অপমান করাও বৈধ নয়।

ভুল দেখলে যেভাবে সংশোধন করবেন

সন্তানের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বাবা-মাকে হার মানানো নয়, বরং তাঁদের ভালো পথে ফিরিয়ে আনা। তাই তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় কঠোরতা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কিংবা অপমানজনক ভাষা পরিহার করতে হবে। সুযোগ বুঝে কোরআন-হাদিসের শিক্ষা তুলে ধরতে হবে।

সরাসরি তর্কে না গিয়ে ভালোবাসা, যুক্তি ও কোমলতার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের মতো জালিম ব্যক্তির কাছেও কোমল ভাষায় কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা উভয়ে তার সঙ্গে কোমল কথা বলবে; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৪৪)

যদি ফেরাউনের মতো ব্যক্তির সঙ্গেও কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ থাকে, তাহলে নিজের বাবা-মায়ের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে সন্তানের ভাষা কতটা কোমল হওয়া উচিত—তা সহজেই বোঝা যায়। তবে ইসলাম অন্যায়কে সমর্থন করতে বলে না। তবে অন্যায় প্রতিরোধের পদ্ধতিও ইসলামী হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য শুধু ভালো ও ন্যায়সংগত কাজে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৪৪)

সুতরাং বাবা-মা যদি সন্তানকে কোনো হারাম কাজে নির্দেশ দেন, সন্তান বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করবে। যেমন—হারাম উপার্জনে সহযোগিতা করা, কারও ওপর জুলুম করা, মিথ্যা বলা, অন্যের অধিকার নষ্ট করা কিংবা কোনো ফরজ ইবাদত ছেড়ে দেওয়া—এসব ক্ষেত্রে তাঁদের কথা মানা যাবে না। তবে ‘আমি আপনার কথা মানব না’—এমন রূঢ় ভাষার পরিবর্তে বিনয়ের সঙ্গে বলা যায়, ‘আব্বু-আম্মু, আপনাদের কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু এই কাজটি আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাই এতে আমি সহযোগিতা করতে পারব না। তবে অন্য যেকোনো বৈধ কাজে আমি আপনাদের পাশে আছি।’ এ ধরনের আচরণে অবাধ্যতাও হয় না, আবার গুনাহেও সহযোগিতা করা হয় না।

নিজের আমল দিয়ে দাওয়াত দেওয়া

বাবা-মাকে সংশোধনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হলো নিজে ভালো হয়ে যাওয়া। সন্তান যদি নিয়মিত নামাজ পড়ে, সত্য কথা বলে, হালাল-হারাম মেনে চলে, বাবা-মায়ের সেবা করে এবং তাঁদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করে—তাহলে তার জীবনই হয়ে উঠতে পারে নীরব দাওয়াত। বিশেষ করে বাবা-মা যদি সন্তানের পরিবর্তন দেখতে পান এবং বুঝতে পারেন যে দ্বীনের পথে চলার কারণে সন্তান আরও বিনয়ী, দায়িত্বশীল ও ভালো মানুষ হয়েছে, তখন তাঁদের হৃদয়েও পরিবর্তনের দরজা খুলে যেতে পারে।

তাঁদের জন্য দোয়া করতে হবে

বাবা-মা ভুল পথে থাকলেও তাঁদের জন্য দোয়া বন্ধ করা যাবে না। বরং তাঁদের হেদায়াতের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর বলো, ‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৪)

সম্পর্ক ছিন্ন করা সমাধান নয়

বাবা-মা ভুল পথে থাকেন বলে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং সুরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াতের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট—আল্লাহর অবাধ্যতার বিষয়ে তাঁদের অনুসরণ করা যাবে না, কিন্তু ‘দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস’ করতে হবে। তাই বাবা-মায়ের ভুলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আর বাবা-মাকে ঘৃণা করা—দুটি এক বিষয় নয়। ভুল কাজকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, কিন্তু মানুষটিকে ভালোবাসতে হবে।

 এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি

১. বাবা-মা হারাম কাজের নির্দেশ দিলে তা মানা যাবে না।

২. তাঁদের ভুলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাঁদের গালি বা অপমান করা যাবে না।

৩. বৈধ বিষয়ে তাঁদের সেবা ও সহযোগিতা করতে হবে।

৪. সম্ভব হলে জ্ঞানী, বিশ্বস্ত আলেম বা পরিবারের সম্মানিত ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

৫. নিজের চরিত্র ও আমলের মাধ্যমে তাঁদের জন্য আদর্শ হতে হবে।

৬. তাঁদের হেদায়াতের জন্য নিয়মিত দোয়া করতে হবে।

৭. তাঁদের ভুলের কারণে নিজেও যেন সেই ভুলে জড়িয়ে না পড়ি—এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

৮. পরিস্থিতি যদি অত্যন্ত জটিল হয়, তাহলে নির্দিষ্ট ঘটনার শরিয়তসম্মত বিধান কোনো যোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উত্তম।

সুতরাং বাবা-মায়ের কোনো ভুল দেখলে সন্তান যেন বিদ্রোহী না হয়ে হিতাকাঙ্ক্ষী হয়, কঠোর না হয়ে কোমল হয়, সম্পর্কচ্ছেদকারী না হয়ে সংশোধনকারী হয়। তাঁদের ভুলের অনুসরণ নয়, আবার তাঁদের অপমানও নয়—বরং নিজের ঈমান অটুট রেখে ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও দোয়ার মাধ্যমে তাঁদের কল্যাণের চেষ্টা করা জরুরি । আল্লাহ তাআলা আমাদের বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণ করার, তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করার এবং প্রয়োজন হলে প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁদের সঠিক পথে আহ্বান করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়