আমিরুল ইসলাম কাগজী:
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলো মূলত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং নিজেদের ক্ষমতা সর্বাধিক করার জন্য প্রতিযোগিতা করে।
কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো সর্বোচ্চ বৈশ্বিক সরকার নেই যে কিনা অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। এই অনিশ্চয়তা থেকেই Great Power Competition বা মহাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই তথ্যকে সামনে রেখে ২০০১ সালে জন. জে. মিয়ারশাইমার রচনা করেন দ্য ট্রাজেডি অফ গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স (The Tragedy of Great Power Politics)। সাড়া জাগানো এই গ্রন্থে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, পৃথিবী এত বড় যে কোনো রাষ্ট্রই বৈশ্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। রাষ্ট্রগুলো যা করতে পারে এবং বাস্তবে যা নির্ভরযোগ্যভাবে করে, তা হলো নিজ নিজ অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সেই ভূমিকাই চায়। আকার, সম্পদ ও সামরিক শক্তির বিচারে এই আকাঙ্ক্ষা বোধগম্য। কিন্তু এসবই প্রতিবেশীদের উদ্দেশে ভারতের ধারাবাহিক উপদেশকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে না।
এ অঞ্চলে ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র শেখ হাসিনার পতনের পর নয়াদিল্লি সরকার এবং ভারতের বহু সংবাদমাধ্যম একটি পরিচিত বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ মৌলবাদীদের হাতে চলে গেছে। প্রতিদিন হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে। এই বয়ানটি ভারত এমনভাবে প্রচার করছে যেন সারা পৃথিবীকে জানানোর দায়িত্ব হয়ে পড়েছে তার। গত দুই বছর ধরেই দেশটি এমন গল্পই বলে আসছে, যার পক্ষে আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত যথেষ্ট সমর্থন দেয় না। আর তা করতে গিয়ে ভারত নিজেকে বড় নয়, বরং ছোট হিসেবেই তুলে ধরেছে।
সন্ত্রাসবাদ দিয়ে শুরু করা যাক—যে অভিযোগটি সবচেয়ে অবাধে করা হয়। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিসের Global Terrorism Index 2026, যা ২০২৫ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, সেখানে ভারত ৬.৪২৮ স্কোর নিয়ে বিশ্বের ১৩তম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ২.২৮৬ স্কোর নিয়ে ৪২তম স্থানে। প্রতিবেদনের বছরটিতে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভারতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে—হামলা ৪৩ শতাংশ কমেছে। তবু ভারত বিশ্বের অন্যতম বেশি সন্ত্রাস-আক্রান্ত রাষ্ট্র হিসেবে রয়ে গেছে। ভারতীয় টেলিভিশনের দর্শক অবশ্য এসব দেখে তা অনুমান করতে পারবেন না। পর্দার বাস্তবতা আর সূচকের বাস্তবতা যেন একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও ভারতের কোনো গৌরবের কারণ নেই। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের 2026 World Press Freedom Index-এ বাংলাদেশ ১৫২তম এবং ভারত ১৫৭তম। দুটিই ‘ভেরি সিরিয়াস’ বা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ শ্রেণিতে রয়েছে। কোনো সরকারেরই এখানে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বিচারিক চাপ, মালিকানার কেন্দ্রীকরণ এবং কোন্ দিকে বাতাস বইছে তা বুঝে নেওয়া নিউজরুমের কারসাজির কারণে ভারত এক বছরে ছয় ধাপ পিছিয়েছে। বিশ্বজুড়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারত বৈশ্বিক অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান এখনও খারাপ। সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে; একটি নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ভীতি ও চাপের সংস্কৃতিও বিলীন হয়ে যায়নি। কিন্তু এই র্যাংকিং অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ভারতকে এই অঞ্চলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ‘বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অধীনে নতুন সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলেছে। অবশ্য, এমন কথা পরীক্ষা নিরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত কেবল কথাই ধরে রাখব। তবু এমন একটি দেশের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি শোনা, যে দেশটি তার প্রতিবেশীর চেয়ে পাঁচ ধাপ নিচে অবস্থান করছে, ভারতের কাছ থেকে পাওয়া নীতিবাক্যের চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হতে পারে।
ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি সবচেয়ে আবেগঘন এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে নিরলসভাবে আলোচিত। এ বিষয়ে কোনো একক সরকারি সূচক নেই। তাই পিউ রিসার্চ, ইউএসসিআইআরএফ(USCIRF) এবং ওপেন ডোরস(OPEN DOORS)—এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন পাশাপাশি পড়তে হয়।
পিউ-এর সর্বশেষ তুলনাযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, উভয় দেশেই সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা উচ্চ এবং সামাজিক বৈরিতার মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ। তবে ভারতের সামাজিক বৈরিতার স্কোর আরও খারাপ। অবশ্য ২০২৩ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় পিউ-এর প্রতিবেদনটি আপাতত পাশে সরিয়ে রাখাই ভালো। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো দেখা যাক।
ইউএসসিআইআরএফের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে টানা সপ্তম বছরের মতো ভারতকে ‘Country of Particular Concern’ বা বিশেষ উদ্বেগের দেশ হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে—এটি সংস্থাটির ব্যবহৃত সবচেয়ে গুরুতর শ্রেণি। ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কমিশন জানায়, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে লক্ষ্য করে সহিংসতা ও উসকানি নিয়মিত ব্যবহৃত হওয়ায় পরিস্থিতির “ক্রমাগত অবনতি” হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিজেপি সরকার আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি বাস্তবায়ন করেছে।
২০২৬ সালের USCIRF (U.S. Commission on International Religious Freedom) Annual Report-এর সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশকে CPC (Country of Particular Concern) বা Special Watch List (SWL)—কোনোটিতেই অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়নি। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য, কারণ ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে USCIRF: ১৮টি দেশকে CPC হিসেবে সুপারিশ করেছে—এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইরান, রাশিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি রয়েছে। ১১টি দেশকে Special Watch List-এ রাখার সুপারিশ করেছে—যেমন মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, মালয়েশিয়া, কাতার, তুরস্ক ও উজবেকিস্তান।
বাংলাদেশ এই দুই তালিকার কোনোটিতেই নেই। ইউএসসিআইআরএফ বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে এবং সাম্প্রদায়িক হামলার বাস্তবতা স্বীকার করেছে—যেসব হামলা কুৎসিত, গুরুতর এবং এখনও অসম্পূর্ণ এক সংকটের অংশ। কিন্তু সংস্থাটি এসব ঘটনাকে ভারতের পরিস্থিতির সমপর্যায়ে রাখেনি।
ওপেন ডোরসের World Watch List 2026-এ ভারত ৮৪ স্কোর নিয়ে ১২তম স্থানে রয়েছে এবং ‘Extreme’ বা ‘চরম’ শ্রেণিতে পড়েছে। বাংলাদেশ ৭১ স্কোর নিয়ে ৩৩তম স্থানে। প্রতিবেদনটির চিত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর জীবন ভারতের তুলনায় অনেক ভালো। তবে এসবের কোনোটিই বাংলাদেশকে একটি সম্পূর্ণ উদার ও আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না। ২০২৪ সালের পর সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে। স্থানীয় পরিষদগুলোও এসব ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। কোনো সূচকে কয়েক ধাপ উন্নতি হলেই মানুষের ভয় দূর হয়ে যায় না।
বিষয়টি আরও সীমিত, কিন্তু দিল্লির জন্য আরও কঠিন: বাংলাদেশকে একটি ভেঙে পড়া ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এবং ভারতকে তার আতঙ্কিত নৈতিক অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপনের যে প্রচার চলছে, ভারত নিজেই যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য সুবিধামতো উদ্ধৃত করে, সেই একই সংস্থাগুলোর তথ্যের মুখোমুখি হলে সেই প্রচার টেকে না।
মহাভারত এখানেও যথার্থ উপমা—শুধু এই কারণে নয় যে ভারতেই এটি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি পড়া হয়। কৃষ্ণ অর্জুনকে ধর্মের কথা বলতে পারেন, কারণ তিনি এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন যেখান থেকে উপদেশ দেওয়া সম্ভব। পাশা কৌশলে সাজিয়ে দেওয়া শকুনির সেই নৈতিক অবস্থান নেই।
আঞ্চলিক প্রাধান্য অর্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো পাপ নয়। এটি রাষ্ট্রগুলোর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডেরই অংশ। জনসংখ্যা ও জিডিপি কোনো দেশের প্রতিবেশীর আত্মপরিচয় নির্ধারণ করার অধিকার দেয় না। দক্ষিণ এশিয়ায় যে দেশটি নেতৃত্বের সুর নির্ধারণ করতে চায়, তার উচিত এমন একটি বাংলাদেশ উদ্ভাবনে কম সময় ব্যয় করা, যে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত কোনো আন্তর্জাতিক সূচক সমর্থন করে না। বরং তার উচিত নিজের দেশের সেই জনতা, সেই আইন এবং সেই অনুগত স্টুডিওগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া, যেগুলোর বর্ণনা স্বাধীন পর্যবেক্ষকেরা বারবার তুলে ধরছেন।





