পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধের সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটে। ২০১৯ সালের বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের পর ‘০০৭’ গ্যাংয়ের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। পরবর্তী সময়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দৃশ্যমান হয়। ২০২৩ সালে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সারা দেশে অন্তত ১৭৩টি কিশোর গ্যাং রয়েছে; এর মধ্যে ঢাকায় ৬৬টি ও চট্টগ্রামে ৫৭টি। পরবর্তীতে, ২০২৪ সালে সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় অন্তত ২৩৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা শহরে, যা প্রায় ১২৭টি এবং সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩৮২ জন। ঢাকার পরের অবস্থান চট্টগ্রাম, যেখানে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৫৭টি। অতীতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই মূলত এসব কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করতো এবং বিভিন্ন অপকর্মে লেলিয়ে দিত।
এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধ দমনে যে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় করা হয়েছে। বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং, উঠান বৈঠক, নিয়মিত কাউন্সেলিং, বিশেষ অভিযান এবং মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের অনলাইন তৎপরতার ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই অবস্থান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, কিশোর গ্যাং দমনে শুধু পুলিশি অভিযান নয়, সামাজিক প্রতিরোধকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অন্যতম ভিত্তি। কারণ একটি কিশোর রাতারাতি অপরাধী হয়ে ওঠে না। তার পেছনে থাকে পরিবার, বন্ধুমহল, সামাজিক পরিবেশ, মাদক, অর্থনৈতিক সংকট, অবহেলা, শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা কিংবা অপরাধী চক্রের প্রভাব। তাই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর কেবল তাকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের মার্চে পুলিশ মহাপরিদর্শক দেশব্যাপী ব্লক রেইডের ঘোষণা দিয়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অপরাধী এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে পুলিশের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি সরকার প্রশাসনিক পর্যায়েও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেলা ও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির কাঠামো পুনর্গঠন করে তাদের কার্যপরিধি বাড়িয়েছে। এসব কমিটিকে কিশোর গ্যাং, মাদক পাচার ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিতভাবে অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কিশোর গ্যাং কোনো একটি থানার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি এলাকার কিশোর অন্য এলাকার অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। মাদকের নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের যোগাযোগের কারণে অপরাধের ধরনও বদলাচ্ছে। ফলে পুলিশ, প্রশাসন, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
রাজধানী ঢাকায়ও কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং পুলিশের সাইবার সক্ষমতা শক্তিশালী করার কথাও বলা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরেও কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডাস্থল ও মাদকের স্পট চিহ্নিত করে সেসব জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা এ কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই আমাদের সমাজের দায়িত্বটি সবচেয়ে বেশি। পুলিশ অভিযান চালাবে, অপরাধী গ্রেপ্তার হবে, মামলা হবে কিন্তু একটি কিশোর কেন গ্যাংয়ে ঢুকল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে পরিবার ও সমাজকে। সন্তান কখন বাসায় ফিরছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, তার আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন এসেছে কি না, সে অস্বাভাবিকভাবে অর্থ ব্যয় করছে কি না, পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে কি না-এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তানকে শুধু শাসন করলে হবে না; তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো বিপদে পড়লে সে পরিবারের কাছেই ফিরে আসতে পারে।
পরিবারের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই কিশোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিসর। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে, আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে কিংবা অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লে শিক্ষকদের তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শাস্তি দিয়ে তাকে দূরে ঠেলে না দিয়ে কাউন্সেলিং, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ একজন কিশোরকে স্কুল থেকে বাদ দেওয়া সহজ; তাকে আবার শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা কঠিন।
সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কিশোরদের শুধু অপরাধ দমনের বিষয় হিসেবে না দেখে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তাকেও গুরুত্ব প্রদান করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও কিশোরদের পুনর্বাসনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আশ্রয়, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা অপরাধমুখী পথ থেকে ফিরে আসতে পারে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের জন্য মানসিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
কিশোরকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো তাকে ইতিবাচক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, পাঠাগার, বিতর্ক, স্কাউটিং, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ যত বাড়বে, অপরাধী চক্রের জন্য কিশোরদের টেনে নেওয়া তত কঠিন হবে। একটি মাঠ হয়তো একটি কিশোরকে অপরাধীর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে; একটি ভালো শিক্ষক হয়তো একটি জীবন বদলে দিতে পারেন; একটি পরিবারের সময়মতো দেওয়া ভালোবাসা হয়তো একটি সন্তানকে ভুল পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
বর্তমান সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো অনলাইন জগৎ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলবদ্ধতার প্রচার, অপরাধের ভিডিও, অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা অপরাধকে ‘সাহসিকতা’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই সরকার অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার ওপর নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। প্রযুক্তিকে অপরাধের হাতিয়ার হতে না দিয়ে অপরাধ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে কিশোরদের ব্যবহার করে যারা অপরাধ পরিচালনা করছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের করছে। মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র সরবরাহকারী, চাঁদাবাজ কিংবা বড় অপরাধী চক্রের সদস্যরা যদি কিশোরদের সামনে রেখে নিজেদের অপরাধ চালায়, তাহলে পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মাদকের উৎস বন্ধ করার বিষয়েও সরকারের চলমান অভিযান সম্প্রতি আরও জোরদার করা হয়েছে। যা খুবই ইতিবাচক কারণ মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তা ভাঙা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
সরকার ইতোমধ্যে মাদকবিরোধী অভিযান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, কর্মশালা, গণশুনানি এবং কাউন্সেলিংয়ের মতো কার্যক্রম চালাচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার যে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়েছে, তা কিশোরদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।
কিশোর গ্যাং এর অপরাধ নির্মূলে সরকারের পক্ষ হতে আরও কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তন্মধ্যে, উন্নত দেশগুলোর ন্যায় বস্তি সংলগ্ন এলাকাগুলোকে (যেমনঃ মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিহারী ক্যাম্প, বনানীর কড়াইল বস্তি প্রভৃতি) সিসিটিভি এর আওতায় আনা-যা অপরাধীদের শনাক্তকরণ দ্রুত ও সহজ করবে। শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া অঙ্গনের প্রতি সম্পৃক্ত করতে বর্তমান সরকারের গৃহীত ‘নতুনকঁড়ি’ উদ্যোগকে দেশব্যাপী অধিকতর সম্প্রসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়া, যে সকল এলাকায় কিশোর অপরাধ সংঘঠিত হবে, সেখানে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে জবাবদিহিতার অংশ হিসেবে প্রেস ব্রিফিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
কিশোর গ্যাং কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রশাসনিক ও সামাজিক পর্যায়ে যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, তার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে জনগণের সহযোগিতার ওপর। অপরাধের তথ্য গোপন না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো, সন্তানদের সময় দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো, এলাকায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা এবং অপরাধপ্রবণ কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া-এসব কাজ সমাজকেই করতে হবে।
কৃষিবিদ মোঃ মনোয়ারুল ইসলাম এনাম
উপ-রেজিস্টার, প্রশাসন ও সংস্থাপন-২, শেকৃবি, ঢাকা।




