spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

নিয়ত যেভাবে বদলে দেয় নেক আমলের প্রতিদান

জেড নিউজ ডেস্ক : 

মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করে। ঘুম থেকে ওঠা, জীবিকা উপার্জন, পরিবারের ভরণপোষণ, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার, অসুস্থের সেবা কিংবা কাউকে সামান্য সহযোগিতা করা—এসবই আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

কিন্তু একই কাজের মাধ্যমে একজন মানুষ অগণিত সওয়াব অর্জন করতে পারে, আবার অন্য একজন সেই কাজ করেও আল্লাহর কাছে কোনো প্রতিদান না-ও পেতে পারে। পার্থক্যটা কোথায়? পার্থক্য হলো নিয়তে, উদ্দেশ্যে এবং কাজটি করার পেছনে থাকা আন্তরিকতায়।

১. নিয়তই আমলের প্রাণ ও প্রতিদানের ভিত্তি : ইসলামে কোনো কাজের বাহ্যিক রূপের পাশাপাশি তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি কাজ কত বড়, কত সুন্দর কিংবা কত মানুষের উপকারে এসেছে, এসবের পাশাপাশি কেন কাজটি করা হয়েছে, সেটিও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

২. একটি আমলেই মিলতে পারে বহুগুণ প্রতিদান : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা নেকি ও পাপের বিষয়টি লিখে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কেউ কোনো নেক কাজের ইচ্ছা করেও তা করতে না পারলে আল্লাহ তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লিখে দেন।

আর কাজটি করার পর তার জন্য দশ থেকে সাত শ গুণ, এমনকি আরো বেশি নেকি লিখে দেন। পক্ষান্তরে কেউ পাপের ইচ্ছা করেও তা না করলে তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লেখা হয়। আর পাপটি করে ফেললে একটি পাপই লেখা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৯১)

৩. অসুস্থতা ও সফরেও আমলের প্রতিদান অব্যাহত থাকে : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো বান্দা অসুস্থ হয় অথবা সফরে থাকে, তখন তার জন্য সেই পরিমাণ আমল লেখা হয়, যতটুকু সে সুস্থ ও নিজ আবাসে অবস্থানকালে করত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৯৯৬)

৪. জীবনের প্রতিটি কাজ ইবাদতে পরিণত হতে পারে : মানুষকে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর ইবাদত করা।

তবে ইবাদত বলতে শুধু নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো আনুষ্ঠানিক ইবাদতকে বোঝায় না। বরং একজন মুমিনের পুরো জীবনই ইবাদতে পরিণত হতে পারে, যদি তার কথা, কাজ ও আচরণের উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)

৫. ঘুম ও বিশ্রামও হতে পারে সওয়াবের মাধ্যম : অনেকেই মনে করেন, সওয়াব অর্জন করতে হলে সারাক্ষণ নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির কিংবা অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতে ব্যস্ত থাকতে হবে। অথচ ইসলামের শিক্ষা আরো ব্যাপক। একজন মুমিন তার দৈনন্দিন অভ্যাস ও বৈধ কাজগুলোকেও সওয়াবের মাধ্যম বানাতে পারেন। একইভাবে শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য বিশ্রাম নেওয়া, সুস্থ থাকার জন্য খাবার গ্রহণ করা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হলে ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের প্রতিটি তাসবিহ সদকা, প্রতিটি তাকবির সদকা, প্রতিটি তাহমিদ সদকা এবং প্রতিটি তাহলিল সদকা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৬)

৬. নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া : আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায় হলো মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করা। বিশেষ করে নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া অনেক বড় মহৎ গুণ। পবিত্র কোরআনে আনসার সাহাবিদের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)

৭. পরিবারের জন্য ব্যয় করাও সদকা : অনেকে মনে করেন, দান-সদকা বলতে শুধু মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা কিংবা অসহায় মানুষকে অর্থ প্রদান করাকেই বোঝায়। অথচ ইসলামে পরিবারের জন্য ব্যয় করাকেও সওয়াবের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি সওয়াবের আশায় তার পরিবারের জন্য ব্যয় করলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০০২)

৮. মানুষের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক লক্ষ্য : সৎকাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো লোকদেখানো মনোভাব বা রিয়া। মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা, বাহবা, সম্মান কিংবা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে ভালো কাজ করে, তখন সেই আমলের প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে সেই ব্যক্তির মতো নিষ্ফল করে দিয়ো না, যে লোকদেখানোর জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৪)

৯. সাহাবিদের জীবনেও ছিল প্রতিদান লাভের প্রত্যাশা : একজন মুমিনের উচিত, প্রতিদিনের কাজের মধ্যে সওয়াব অর্জনের সুযোগ খুঁজে নেওয়া। কাউকে সাহায্য করা, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা, মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করা কিংবা কাউকে ভালো কথা বলাও সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৬)

১০. আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান কখনো নষ্ট করেন না : মানুষের জীবনে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি আসে, যখন ভালো কাজ করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস থাকা উচিত, মানুষের কাছে প্রতিদান না পেলেও আল্লাহর কাছে তার কোনো ভালো কাজ হারিয়ে যাবে না। কারণ, আল্লাহ কখনো সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কোনো কর্মশীলের কর্ম নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯৫)

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত করার এবং ইখলাসের সঙ্গে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়