spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

ভাত শালিক— ‘পরিপাটি ও সুশ্রী’ খেতাব থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ‘সবচেয়ে ঘৃণিত পাখি’

জেড নিউজ ডেস্ক : 

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় কোলাহলপ্রিয় ও সাহসী এ বহিরাগত পাখি নির্মূলের চেষ্টা করছে। তবে এমন উদ্যোগ অস্ট্রেলিয়ায় নতুন নয়। ২০১২ সালে ক্যানবেরার বাসিন্দারা ময়নার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তৃণমূল পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর আগে ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) ‘ময়নার বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে পাখিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়েছিল। অবশ্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেও খুব বেশি যে কাজ হয়েছে এমন নয়

কমন ময়না বা ভাত শালিককে অনেকে ‘অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ঘৃণিত পাখি’ বলেন। এ পাখি আদি বাসভূমি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার। তাইওয়ান থেকে মরিশাস, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা—যেখানেই ভাত শালিক বিস্তার লাভ করেছে, সেখানেই ভালোভাবে টিকে গেছে। ২০০০ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বিশ্বের ১০০টি সবচেয়ে ক্ষতিকর আগ্রাসী প্রজাতির যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতেও জায়গা পায় পাখিটি।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় কোলাহলপ্রিয় ও সাহসী এ বহিরাগত পাখি নির্মূলের চেষ্টা করছে। তবে এমন উদ্যোগ অস্ট্রেলিয়ায় নতুন নয়। ২০১২ সালে ক্যানবেরার বাসিন্দারা ময়নার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তৃণমূল পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর আগে ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) ‘ময়নার বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে পাখিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়েছিল। অবশ্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেও খুব বেশি যে কাজ হয়েছে এমন নয়।

কুইন্সল্যান্ডে সত্যিই ময়নার সংখ্যা বাড়ছে, নাকি মানুষ আগের চেয়ে বেশি পাখিগুলোকে লক্ষ করছে, তা নিশ্চিত নয় কেউ। তবে গবেষণা বলছে, জাতীয় পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে বহিরাগত পাখিদের ওপর মানুষের নজরদারি ও সমালোচনা বেড়ে যায়। এর আগেও ‘অভিবাসী পাখি’ হিসেবে পরিচিত লালগাল বুলবুলকে ঘিরে তৈরি আতঙ্কে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল। ভাত শালিককে ঘিরেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কিনা, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—ময়না যে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবেই থেকে যাবে, তা কি মেনে নেয়ার সময় এখনো হয়নি?

প্রশংসা থেকে ঘৃণা

১৮৬২ সাল থেকে ভিক্টোরিয়ায় ভাত শালিকের উপস্থিতি রয়েছে। কুইন্সল্যান্ডের ইনহাম ও টাউনসভিল এলাকায় নিয়ে আসা হয় ১৮৮৩ সালে। উদ্দেশ্য ছিল পঙ্গপাল ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে আনা। পরবর্তী সময়ে ক্যান টোড আনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের যুক্তি দেখানো হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬৪ বছর ধরে অবস্থানকালে কমন ময়নাকে ঘিরে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৮৬৮ সালেই ফল খাওয়া ও ক্ষতি করার জন্য পাখিটির পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। তবে পোকামাকড় খাওয়ার উপকারিতা তখন এসব ক্ষতির বিষয়টিকে অনেকটা ভারসাম্যে রেখেছিল।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ায় বার্ড ওয়াচিং একটি সুসংগঠিত ও জনপ্রিয় শখে পরিণত হয়। ওই সময়ের পাখিপ্রেমীরা প্রায়ই ময়নার প্রশংসা করতেন। ১৮৮৬ সালে সিডনির গ্লোব পত্রিকায় এক অজ্ঞাতনামা লেখক ময়নাকে বর্ণনা করেছিলেন ‘প্রিয়, শান্ত, প্রাণবন্ত ও অত্যন্ত বিনোদনপ্রিয়’ পাখি হিসেবে। ১৯০৬ সালে প্রকৃতিবিদ চার্লস ব্যারেট মেলবোর্নের ময়নাকে বলেছিলেন ‘অত্যন্ত পরিপাটি ও সুশ্রী’।

১৯৭১ সালেও অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পাখিপ্রেমী অ্যালেক চিশলম সিডনি মর্নিং হেরাল্ড-এ লিখেছিলেন, ‘এটা স্পষ্ট, ভারতের পাখিটি এখন অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ। এটি আপত্তিকর কোনো প্রাণী নয়। অর্থনৈতিকভাবে কোনো ক্ষতি করে না। বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হেঁটে বেড়ানো এবং রাস্তা ও পার্কে পোকামাকড় ও খাবারের উচ্ছিষ্ট খুঁজতে খুঁজতে প্রাণবন্ত কিচিরমিচির করার কারণে একে বিনোদনদায়ী পাখি হিসেবেই দেখা হয়।’

সত্তরের দশকে এসে জনমনে পাখিটি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে বদলাতে শুরু করে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ‘আগ্রাসী’ প্রজাতি হিসেবে পরিচিত প্রাণীদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিক্রিয়ার অংশ হয়ে ভাত শালিকের প্রতি ঘৃণা আরো গভীর হয়। ‘প্রাণবন্ত’ ও ‘পরিপাটি’ পরিচয় হারিয়ে ভাত শালিক হয়ে উঠে ‘দুঃসাহসী, উদ্ধত এবং ভয়ংকর আক্রমণাত্মক’।

কিছু লেখায় প্রকাশিত ভাষা প্রায় সরাসরি বিদেশীবিদ্বেষের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ১৯৮৮ সালে ক্যানবেরা টাইমসের একটি প্রতিবেদনে পুরনো দেশীয় গাছের সারিকে বর্ণনা করা হয়েছিল এভাবে, ‘ময়নাদের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাট। সেখানে মাঝেমধ্যে দেখা যায় লালচে ও পূর্বাঞ্চলীয় রোজেলা (স্থানীয় রঙিন টিয়া)। এমন একটি প্রতিবেশে এসব অভিবাসী পাখি ছড়িয়ে পড়ে, আধিপত্য বিস্তার করে এবং পরিবেশ বদলে দেয়। এ যেন এশীয় অভিবাসনের বিরোধীদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কারই প্রতিচ্ছবি।’

একই লেখকের ১৯৯০ সালের আরেকটি প্রতিবেদনে ময়নাকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘বিদেশী দাপুটে’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছিল।

জনমনে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলেও ভাত শালিক অস্ট্রেলিয়ার দেশীয় বন্যপ্রাণীর ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে গবেষণা প্রকাশ শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে।

গবেষকরা দেখতে পান, ময়না প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সীমিত জায়গা দখল করতে দেশীয় টিয়াপাখিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারে। এ নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত একটি গবেষণায় ময়নাকে বলা হয়েছিল ‘উড়ন্ত ক্যান টোড’ এবং ‘পাখিজগতের সাধারণ গুন্ডা’।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়— কয়েক দশকে বিস্তৃতি ও সংখ্যা বাড়লেও ১৮৬০ বা ১৯৪০-এর দশকে পাখিটি যেমন দেখতে ছিল, আচরণও ছিল যেমন, এখনো তা-ই। পরিবর্তন এসেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে। মানুষের চোখে একসময় বন্ধুসুলভ প্রাণী হিসেবে পরিচিত পাখিটি পরিণত হয়েছে অশুভ ও ঘৃণ্য এক প্রাণীতে।

ময়না কি থাকবে?

অস্ট্রেলিয়ায় এখন ময়নার প্রতি ঘৃণা যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মানুষের অনুভূতি যা-ই হোক, পাখিগুলো যে দেশটিতে থেকে যাবে, সে সম্ভাবনাই বেশি। যেসব এলাকায় নিয়মিত ফাঁদ পেতে ময়না ধরা হয়, সেখানে পাখিগুলো ছোট ছোট দলে থাকে এবং বেশি সময় লুকিয়ে কাটায়। ফলে ফাঁদ পেতে পাখির সংখ্যা কমানো যাচ্ছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়, তা বিভ্রমও হতে পারে। কিছু জায়গায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে কমন ময়নাকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সব জায়গায় তা সম্ভব নয়।

ময়নার সংখ্যা সফলভাবে কমানো গেলেও তাতে পরিবেশগত সব সমস্যার সমাধান হবে না। ফাঁদ পেতে ময়না কমানোর ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করতে পারে নয়েজি মাইনার নামের আরেকটি পাখি। এটি অস্ট্রেলিয়ারই স্থানীয় প্রজাতির মধুখেকো পাখি। তবে এই পাখিও সংকুচিত হয়ে আসা আবাসস্থল থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রজাতিগুলোকে তাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, একটি ‘সমস্যা’ হিসেবে বিবেচিত প্রজাতির জায়গায় আরেকটি প্রজাতি এসে হাজির হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়