জেড নিউজ, ঢাকা:
ত্বকের যত্ন নিতে অনেকেই বয়স অনুযায়ী নানা প্রসাধনী ব্যবহার করেন। ৩০ বছর হলেই চোখের জন্য আলাদা ক্রিম, বলিরেখা কমাতে রেটিনল কিংবা ত্বক উজ্জ্বল করতে ভিটামিন সি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু সব ধরনের ত্বকের জন্য সব প্রসাধনী প্রয়োজনীয় নয়। বরং ত্বকের ধরন, সমস্যা ও প্রয়োজন বুঝে সঠিক পণ্য বেছে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ত্বকের যত্ন নিয়ে এমন পরামর্শ দিয়েছেন ভারতের গুরুগ্রামের মেদান্ত হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগের সহযোগী পরিচালক চিকিৎসক রমনজিৎ সিং। প্রতিবেদনে ভিটামিন সি, রেটিনল, চোখের ক্রিম এবং বয়সভেদে ত্বকের যত্নের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
ভিটামিন সি কখন ব্যবহার করবেন
ভিটামিন সি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। বিশের কোঠায় থাকা ব্যক্তিরাও ত্বকের অসম রং, অনুজ্জ্বলতা কিংবা কালচে দাগ কমানোর উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করতে পারেন। ভিটামিন সি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ত্বককে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে সুরক্ষা দিতে এবং কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে।
তবে নতুন করে ব্যবহার শুরু করলে কম ঘনত্বের, অর্থাৎ ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভিটামিন সি আছে—এমন পণ্য বেছে নেওয়া যেতে পারে।
সংবেদনশীল ত্বকে কিছু ফর্মুলা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই উপযুক্ত পণ্য নির্বাচন এবং প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
বিশের কোঠায় রেটিনল কি প্রয়োজন
রেটিনল ভিটামিন এ-এর একটি উপাদান, যা ব্রণ, ত্বকের অসম রং এবং সূক্ষ্ম বলিরেখা কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে বিশের কোঠায় পৌঁছালেই এটি ব্যবহার করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
নতুন ব্যবহারকারীরা কম ঘনত্বের রেটিনল সপ্তাহে এক বা দুই দিন ব্যবহার করে দেখতে পারেন।
ত্বক সহ্য করতে পারলে ধীরে ধীরে ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো যায়। পাশাপাশি ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার জরুরি। গর্ভাবস্থায় কিংবা সন্তান নেওয়ার চেষ্টা চলাকালে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রেটিনলসহ রেটিনয়েড ব্যবহার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ব্রণ হলে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক করবেন না
প্রাপ্তবয়স্কদের ব্রণ কমাতে বারবার মুখ ধোয়া কিংবা একসঙ্গে অনেক ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করা ঠিক নয়। দিনে দুবার মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা এবং ত্বকের ধরন অনুযায়ী নন-কমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্যালিসিলিক অ্যাসিড লোমকূপের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, বেনজয়েল পারঅক্সাইড ব্রণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ও প্রদাহ কমাতে সহায়ক। ব্রণের পর তৈরি হওয়া দাগ কমাতেও অ্যাজেলাইক অ্যাসিড ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে একসঙ্গে একাধিক কার্যকর উপাদান ব্যবহার না করে একটি দিয়ে শুরু করা ভালো। ব্রণ দীর্ঘস্থায়ী হলে, ব্যথা করলে কিংবা দাগ তৈরি হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চোখের জন্য আলাদা ক্রিম কি দরকার
ত্রিশের কোঠায় পৌঁছালেই চোখের চারপাশের ত্বকের জন্য আলাদা ক্রিম ব্যবহার করতে হবে, এমন নয়। সাধারণত মৃদু ফেস ময়েশ্চারাইজার চোখের নিচের ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে যথেষ্ট হতে পারে, যদি তাতে জ্বালাপোড়া না হয়।
তবে চোখের নিচে শুষ্কতা, ফোলাভাব কিংবা সূক্ষ্ম রেখার মতো নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে উপাদান অনুযায়ী বিশেষ আই ক্রিম কাজে আসতে পারে। যেমন, ময়েশ্চারাইজিং উপাদান শুষ্কতার কারণে তৈরি হওয়া সূক্ষ্ম রেখা কম দৃশ্যমান করতে পারে। ক্যাফেইন সাময়িকভাবে ফোলাভাব কমাতেও সাহায্য করতে পারে।
চোখের চারপাশের ত্বক বেশ সংবেদনশীল। তাই এ অংশে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে এমন পণ্য এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত সানস্ক্রিন ও সানগ্লাস ব্যবহার করা প্রয়োজন।
বয়স বাড়লে কোন প্রসাধনী বেশি জরুরি
ত্বকের বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন ঠেকাতে দামি প্রসাধনীর চেয়ে নিয়মিত যত্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক পরিষ্কারের জন্য মৃদু ক্লিনজার, আর্দ্রতা ধরে রাখতে ময়েশ্চারাইজার এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষায় সানস্ক্রিন—এই তিনটি হলো ত্বকের যত্নের মৌলিক ধাপ।
বিশের কোঠায় ত্বকে কালচে দাগ বা অনুজ্জ্বলতা থাকলে ভিটামিন সি ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্রণ কিংবা সূর্যের ক্ষতির কারণে ত্বকে পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে রেটিনয়েড ব্যবহারের কথা ভাবা যায়। তবে বয়স বাড়লেই এসব উপাদান ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়।
চল্লিশের পর অনেকের ত্বক আগের তুলনায় শুষ্ক হয়ে যায়। বয়সজনিত পরিবর্তনের পাশাপাশি হরমোনের ওঠানামা, বিশেষ করে মেনোপজের আগে ও পরে, ত্বকের আর্দ্রতা ও স্থিতিস্থাপকতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে সিরামাইড ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে, গ্লিসারিন ও হায়ালুরোনিক অ্যাসিড আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং পেট্রোলাটাম ত্বক থেকে আর্দ্রতা বেরিয়ে যাওয়া কমাতে সহায়তা করে। ত্বক বেশি শুষ্ক হলে হালকা লোশনের পরিবর্তে ঘন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার আরামদায়ক হতে পারে।
ত্বকে অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহারের লক্ষণ
একসঙ্গে অনেক ধরনের কার্যকর উপাদান ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব, টানটান অনুভূতি, খোসা ওঠা কিংবা অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে। আগে যে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে সমস্যা হতো না, সেটিও তখন জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে।
রেটিনল, এক্সফোলিয়েটিং অ্যাসিড ও বেনজয়েল পারঅক্সাইডের মতো উপাদান পরিকল্পনা ছাড়া একসঙ্গে ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালাপোড়ার ঝুঁকি বাড়ে। এমন সমস্যা দেখা দিলে বিরক্তি সৃষ্টি করা উপাদানগুলো সাময়িক বন্ধ করে মৃদু, সুগন্ধিমুক্ত ক্লিনজার ও ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত। সমস্যা না কমলে বা বাড়তে থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
পঞ্চাশের পরও কি সব প্রসাধনী প্রয়োজন
পঞ্চাশ ও ষাটের কোঠায় ত্বকের যত্নে আর্দ্রতা ধরে রাখা, সূর্যের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা এবং ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ভালো রাখার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ সময় ত্বক পাতলা, শুষ্ক ও কম স্থিতিস্থাপক হতে পারে।
সিরামাইড, গ্লিসারিন কিংবা হায়ালুরোনিক অ্যাসিডযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। প্রতিদিন অন্তত এসপিএফ ৩০-এর ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি। সূক্ষ্ম বলিরেখা কমাতে রেটিনয়েড কাজে লাগতে পারে, তবে পরিণত ও সংবেদনশীল ত্বকে এটি ধীরে এবং সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত।
এই বয়সে আলাদা আই ক্রিম, ফেস মিস্ট, টোনার, স্ক্রাব কিংবা একাধিক সিরাম ব্যবহার করাও বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণ ক্লিনজার, উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন দিয়েই ত্বকের মৌলিক যত্ন নেওয়া সম্ভব।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্বকের যত্নে বয়সকে একমাত্র নির্দেশক না ধরে ত্বকের বর্তমান অবস্থা ও নির্দিষ্ট সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। জটিল রূপচর্চার চেয়ে সহজ, নিয়মিত ও ত্বক-উপযোগী পরিচর্যাই বেশি কার্যকর হতে পারে।





