spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

ইসলামে জ্ঞানীদের অনন্য মর্যাদা

জেড নিউজ , ঢাকা :

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তার সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থানে নয়; মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ঈমান ও চরিত্রে। সম্পদ মানুষকে সাময়িক সম্মান এনে দিতে পারে, ক্ষমতা মানুষকে মানুষের সামনে বড় করে তুলতে পারে; কিন্তু জ্ঞান মানুষকে সত্যের সন্ধান দেয়, স্রষ্টাকে চিনতে শেখায় এবং জীবনের সঠিক পথের সন্ধান দেয়।

এ কারণেই ইসলামে জ্ঞান ও জ্ঞানীদের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যার প্রথম ওহির সূচনাই হয়েছে ‘ইকরা’—পড়ো শব্দের মাধ্যমে। অর্থাৎ ইসলামী জীবনদর্শনে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব শুরু থেকেই সুস্পষ্ট। কোরআন একদিকে মানুষকে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করেছে, অন্যদিকে জ্ঞানীদের মর্যাদা সাধারণ মানুষের তুলনায় বিশেষভাবে ঘোষণা করেছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)

আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের সঙ্গে জ্ঞানীদের বিশেষ মর্যাদা ঘোষণা করে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তর উন্নত করবেন।’ (সুরা : মুজাদালাহ, আয়াত : ১১)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, জ্ঞান শুধু পার্থিব সম্মানের মাধ্যম নয়; আল্লাহর কাছে মর্যাদা বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে এখানে জ্ঞানের সঙ্গে ঈমানের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে জ্ঞান মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য করে, অহংকারী করে এবং সত্য প্রত্যাখ্যানের দিকে নিয়ে যায়, তা ইসলামের কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান নয়।

প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে আল্লাহভীরু করে

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা জ্ঞানীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ২৮)

অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞান যত বাড়বে, আল্লাহর প্রতি ভয়, শ্রদ্ধা ও আনুগত্যও তত গভীর হওয়ার কথা। এখানে ‘জ্ঞানী’ বলতে শুধু বহু তথ্য মুখস্থ করা মানুষকে বোঝানো হয়নি; বরং এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যার জ্ঞান তাকে আল্লাহর মহত্ত্ব উপলব্ধি করায় এবং তাঁর সামনে বিনয়ী করে। তাই কেউ যদি অনেক কিছু জানে, কিন্তু তার জ্ঞান তাকে অহংকারী, উদ্ধত ও পাপাচারী করে তোলে, তবে সেই জ্ঞান তার জন্য কল্যাণের কারণ না-ও হতে পারে।

মহানবী (সা.)-কেও জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া শেখানো হয়েছে

জ্ঞান কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য একটি বিষয়ই যথেষ্ট—আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে বলেছেন।

আল্লাহ বলেন, ‘আর বলুন, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১১৪)

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা নবী (সা.)-কে সম্পদ, ক্ষমতা বা পার্থিব প্রাচুর্য বৃদ্ধির পরিবর্তে জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া করতে বলেছেন। এতে জ্ঞানের বিশেষ মর্যাদা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। একজন মুমিনের তাই সারাজীবনের একটি আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত—‘হে আল্লাহ, আমাকে উপকারী জ্ঞান দান করুন এবং সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিন।’

দ্বিনের জ্ঞান লাভ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ

হজরত মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১)

তাই কোনো ব্যক্তি যখন কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আকিদা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে শেখার সুযোগ পান, তখন তার উচিত এটিকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ মনে করা এবং সেই জ্ঞানকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

জ্ঞান অর্জন জান্নাতের লাভের মাধ্যম

জ্ঞান অর্জন শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; এটি জান্নাতের পথও সহজ করে দেয়। হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন।’ হাদিসে আরো এসেছে, জ্ঞান অন্বেষণকারীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ফেরেশতারা তাদের ডানা বিছিয়ে দেন এবং আসমান-জমিনের অধিবাসীরা আলেমের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই হাদিসে আলেমের মর্যাদাকে পূর্ণিমার চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে—আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৪১)

কী অসাধারণ মর্যাদা! একজন জ্ঞান অন্বেষণকারী যখন সত্য জ্ঞান অর্জনের পথে হাঁটেন, তখন তার সেই পথ শুধু দুনিয়ার জ্ঞানার্জনের পথ থাকে না; তা আখিরাতের সফলতার পথেও পরিণত হয়।

আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। নবীগণ কোনো দিনার বা দিরহাম উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাননি; তাঁরা জ্ঞান রেখে গেছেন। যে ব্যক্তি সেই জ্ঞান গ্রহণ করেছে, সে বিপুল অংশ গ্রহণ করেছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৪১)

নবীদের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার ছিল হেদায়াত ও জ্ঞান। তাই আলেমরা যখন কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান ধারণ করেন এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তখন তাঁরা নববী জ্ঞানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন। এই কারণেই একজন প্রকৃত আলেমের মর্যাদা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জ্ঞানের কারণে নয়; বরং তিনি যে জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তার কারণেও তিনি সম্মানের অধিকারী।

একজন মানুষ একা নামাজ পড়লে তার ইবাদতের উপকার মূলত তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু একজন আলেম যখন মানুষকে নামাজ শেখান, কোরআন বোঝান, হালাল-হারামের জ্ঞান দেন এবং মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, তখন তাঁর জ্ঞানের কল্যাণ বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এ কারণেই ইসলামে উপকারী জ্ঞান একটি চলমান কল্যাণের উৎস।

রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্ঞানীদের গুরুত্ব বোঝাতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মানুষের অন্তর থেকে জ্ঞান ছিনিয়ে নেবেন না; বরং আলেমদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে জ্ঞান উঠিয়ে নেবেন।’ এরপর এমন অবস্থা হবে যে মানুষ অজ্ঞ লোকদের নেতা বানাবে। তাদের কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা জ্ঞান ছাড়াই ফতোয়া দেবে; ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০০; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৭৩)

জ্ঞান ও আমল একে অপরের পরিপূরক

ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই একজন মানুষ পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানী হয়ে যান না। জ্ঞানের আসল সৌন্দর্য প্রকাশ পায় যখন তা মানুষের আমল ও চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। একজন মানুষ যদি জানেন যে মিথ্যা বলা হারাম, কিন্তু নিজেই মিথ্যা বলেন; জানেন যে অহংকার নিন্দনীয়, কিন্তু নিজেই অহংকারী হন; জানেন যে গীবত হারাম, কিন্তু নিয়মিত গীবত করেন—তাহলে তাঁর জ্ঞান তাঁর জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। তাই প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যার জ্ঞান তাকে আল্লাহভীরু, বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ, আমানতদার ও মানুষের জন্য কল্যাণকর করে তোলে।

আল্লাহ তায়ালা জ্ঞানীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন, তাঁদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে আল্লাহভীতির কথা বলেছেন এবং তাঁর নবী (সা.)-কে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বিনের জ্ঞানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের নিদর্শন বলেছেন এবং জ্ঞানার্জনের পথকে জান্নাতের পথ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অনেক কিছু জানা নয়; বরং সঠিক জ্ঞান অর্জন করা, সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করা এবং তা মানুষের কল্যাণে ছড়িয়ে দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের উপকারী জ্ঞান অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়