জেড নিউজ, ঢাকা:
কিছু তারকা পর্দায় আসেন, আলো ছড়ান, তারপর সময়ের স্রোতে হারিয়ে যান। আবার কেউ কেউ চলে গিয়েও থেকে যান দর্শকের হৃদয়ে। তাদের অভিনয়, হাসি, পোশাক, সংলাপ কিংবা পর্দায় উপস্থিতির ভঙ্গি প্রজন্ম পেরিয়ে নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। সালমান শাহ তেমনই এক নাম। মৃত্যুর তিন দশক পূর্ণ হতে চললেও তার জনপ্রিয়তায় যেন ভাটা নেই। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, নব্বইয়ের সেই স্বপ্নের নায়ককে ঘিরে নতুন করে তৈরি হচ্ছে আগ্রহ, আবেগ আর নস্টালজিয়া। ‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে, সারা পৃথিবী তাকে মনে রাখবে’—গানের এই পঙ্ক্তিগুলো যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায় সালমান শাহর জীবনের সঙ্গে। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি যা করে গেছেন, তা আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা একটি অধ্যায়। স্নিগ্ধ হাসি, স্মার্ট উপস্থিতি, সাবলীল অভিনয় আর নিজস্ব ফ্যাশন—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রজন্মের স্বপ্নের নায়ক।
যে দুপুরে থমকে গিয়েছিল দেশ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। শুক্রবারের সেই দিনটিও শুরু হয়েছিল অন্যসব দিনের মতোই। কিন্তু বিকেল গড়াতেই বদলে যায় দেশের আবহ। বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিকেল ৫টার সংবাদে যখন জানানো হলো, জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ আর নেই, তখন যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো দেশ।
মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে যে তরুণ লাখো দর্শকের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তার এমন আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি ভক্তরা। চারদিকে নেমে আসে শোকের ছায়া। সালমানের মৃত্যুর খবর দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। তার চলে যাওয়ার পর ঢালিউডে তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা, যার কোনো তাৎক্ষণিক বিকল্প তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে পরবর্তী সময়ে অনেক নায়ককে সালমানের আদলে সাজিয়ে পর্দায় হাজির করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পোশাক, চুলের স্টাইল, আচরণ সবকিছুতেই ছিল তার ছাপ। কিন্তু দর্শকের ভালোবাসায় জায়গা করে নেওয়া সালমানের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেননি কেউ। কারণ সালমান শুধু একজন নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।
নায়ক হওয়ার আগেই তারকা সালমান শাহর চলচ্চিত্রে অভিষেক ১৯৯৩ সালে, সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। প্রথম সিনেমাতেই ইমন নামে পরিচিত এই তরুণ অভিনেতা হয়ে ওঠেন দর্শকের নতুন আবিষ্কার। এরপর ‘সালমান শাহ’ নামটিই ধীরে ধীরে পরিণত হয় তারকা পরিচয়ে।
তবে অভিনয়ের জগতে তার উপস্থিতি একেবারে হঠাৎ নয়। আশির দশকের মাঝামাঝি হানিফ সংকেতের গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায় প্রচারিত ‘কথার কথা’ অনুষ্ঠানের একটি মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ গানের ভিডিওতে অপূর্ব চরিত্রে দেখা যায় তরুণ সালমানকে। সেখান থেকেই বিনোদন অঙ্গনে তার যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দাড়িয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে জন্ম তার। বাবা কমরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। মা নীলা চৌধুরী রাজনীতি ও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা সালমানের ভেতরে ছোটবেলা থেকেই ছিল শিল্পের প্রতি আলাদা টান।
পর্দার বাইরেও ছিলেন ট্রেন্ডসেটার সালমান শাহর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি শুধু অভিনয় দিয়ে নয়, নিজের স্টাইল দিয়েও একটি প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকে তরুণদের পোশাক ও চুলের স্টাইলের কথা উঠলে অবধারিতভাবেই সামনে আসে সালমানের নাম।
ব্যাকব্রাশ চুল, মাথায় ব্যান্ডেনা, টি-শার্ট, জিন্স, বাহারি টুপি, কলারে রুমাল কিংবা হাতে ঘড়ি—তার ব্যবহার করা প্রায় প্রতিটি ফ্যাশন অনুষঙ্গই হয়ে উঠেছিল তরুণদের কাছে অনুসরণীয়। রাস্তায় বের হলে সালমানের মতো চুল কিংবা পোশাকে তরুণদের দেখা যেত। বলা যায়, অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটি ফ্যাশন ট্রেন্ড। তাকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনাও ছিল বিস্ময়কর। ১৯৯৪ সালে ‘তুমি আমার’ সিনেমার আউটডোর শুটিংয়ে কক্সবাজারে থাকা অবস্থায় এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল বলে আনন্দ বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়েছিল। অটোগ্রাফ না পেয়ে এক তরুণী পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি সালমানের নজরে এলে তিনি দ্রুত তাকে নিবৃত্ত করেন এবং এমন কাজ না করার জন্য বোঝান।
ঘটনাটি আজও সালমানকে ঘিরে থাকা অগণিত ভক্ত-উন্মাদনার একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। তার মৃত্যুর এত বছর পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে আলোচনা, স্মৃতিচারণ কিংবা তার পুরোনো ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য প্রমাণ করে—সালমানের জনপ্রিয়তা কেবল একটি সময়ের মধ্যে আটকে নেই।
কেন এত বছর পরও সালমান?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনেক জনপ্রিয় নায়ক এসেছেন, দর্শকের ভালোবাসাও পেয়েছেন। কিন্তু সালমান শাহর ক্ষেত্রে বিষয়টি যেন একটু আলাদা। তার ক্যারিয়ার ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক তারকা। অভিনয়ের পাশাপাশি পোশাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ধরন থেকে শুরু করে পর্দায় নায়কের উপস্থাপন—সবকিছুতেই ছিল নিজস্বতা। তার অভিনীত চরিত্রগুলোও ছিল বৈচিত্র্যময়। কখনো রোমান্টিক তরুণ, কখনো বিদ্রোহী যুবক, কখনো আবেগপ্রবণ প্রেমিক। প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজের আলাদা ছাপ রেখে গেছেন। সম্ভবত এ কারণেই নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি পুরোনো হয়ে যাননি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে নবীন দর্শকের কাছেও বারবার ফিরে আসছেন সেই স্বপ্নের নায়ক।
মৃত্যুর রহস্য, স্মৃতির অনুসন্ধান সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে রহস্য ও বিতর্কও তার স্মৃতিকে আরও আলোচনায় রেখেছে। ১৯৯৬ সালের সেই আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকেই নানা প্রশ্ন ঘুরে বেড়িয়েছে। আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণ। সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে নানা আলোচনা ও তদন্ত। গত ৯ আগস্ট নায়কের মৃত্যুর ঘটনায় খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খল চরিত্রের অভিনেতা ডন হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন—সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।




