spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

ধ্বংসের পরও চাষাবাদে ফিরছেন ফিলিস্তিনি কৃষকেরা, চলছে অস্তিত্বে ফেরার লড়াই

জেড নিউজ ডেস্ক:

ইসরাইলি সেনাবাহিনী বুরিন গ্রামে ঢুকলেই ঘাসান নাজ্জারের ফোন বেজে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে। সাঁজোয়া যান নিয়ে সেনারা গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসে এবং একে একে দোকানপাট বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে, বসতিস্থাপনকারীদের হামলাও নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাজ্জারসহ প্রায় দুই ডজন কৃষক বুরিনের ‘ল্যান্ড অ্যান্ড ফার্মিং কো-অপারেটিভ’-এর সদস্য। সামরিক শক্তির দিক থেকে ইসরাইলের সঙ্গে লড়াই করার সক্ষমতা তাদের নেই। তাই তাদের প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র জমি—নিজেদের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা এবং সেখানে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া।

১৩ জুলাইয়ের ঘটনা তাদের এই সংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ওই দিন এক ইসরাইলি সমবায়ের একটি গ্রিনহাউসে তার পশুপাল ঢোকানোর চেষ্টা করে। কৃষকেরা পশুগুলো সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করলে ইসরাইলি সীমান্ত পুলিশ সেখানে আসে। নাজ্জার পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করেন, যে জমিকে সেনাবাহিনী ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করেছে, সেখানে একজন বসতিস্থাপনকারী কীভাবে ঢুকতে পারছেন।

ওই ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হয়ে নাজ্জারকে হুমকি দিয়ে বলেন, এর ফল তোমরা টের পাবে।

পরের রাতেই প্রায় ১০ জন বসতিস্থাপনকারী এসে সমবায়ের পাঁচটি গ্রিনহাউস তছনছ করে। তারা প্লাস্টিকের আবরণ কেটে ফেলে এবং সেচব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। সমবায়ের হিসাবে শুধু প্লাস্টিকের ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ হাজার শেকেল (প্রায় ১০,০০০ মার্কিন ডলার)।

একই দিন কেনা হয়েছিল প্রায় ৯ হাজার টমেটোর চারা, যার মূল্য প্রায় ৮ হাজার শেকেল। অন্যত্র রাখার সুযোগ না থাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চারাগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

প্রায় ২৫টি পরিবার এই সমবায়ের জমি, শ্রম ও উৎপাদন ভাগাভাগি করে। নাজ্জারের ভাষায়, চলতি বছর তাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন। শুধু গ্রিনহাউস নয়, কয়েক সপ্তাহ পর বুরিনে দেড় হাজারের বেশি জলপাইসহ বিভিন্ন গাছও ধ্বংস করা হয়। কিছু গাছে আগুন দেওয়া হয়, আবার কিছু কেটে ফেলা বা সামরিক বুলডোজারে উপড়ে ফেলা হয়।

গমের ক্ষেতও রক্ষা পায়নি। সমবায় প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটার (২.৫ একর) জমিতে গম চাষ করেছিল। ফসল কাটার আগেই প্রায় ৭ হাজার বর্গমিটার জমির গম পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

‘টম অ্যান্ড জেরি’ কর্মসূচি

এই পরিস্থিতিতে কৃষকেরা তাদের প্রতিরোধের কৌশলকে মজা করে ‘টম অ্যান্ড জেরি প্রোগ্রাম’ নামে অভিহিত করেছেন। নাজ্জার বলেন, তারা প্রতিদিন ভোরে জমিতে যান। সেনাবাহিনী এলে পালিয়ে যান, সেনারা চলে গেলে আবার জমিতে ফিরে আসেন।

কখনও জমিতে চাষ বা ফসল কাটার কাজ না থাকলেও তারা সেখানে গিয়ে কফি পান করেন। উদ্দেশ্য একটাই—বসতিস্থাপনকারী ও সেনাদের বোঝানো, এটি আমাদের জমি এবং আমরা এখান থেকে চলে যাব না।

২০২০ সালের মার্চে সমবায়টি প্রতিষ্ঠা করেন নাজ্জার। বর্তমানে এর সদস্য প্রায় ২৫ জন, যাদের ১৭ জন নারী। তারা বুরিনের আশপাশে প্রায় ২৫ হাজার বর্গমিটার জমিতে যৌথভাবে চাষাবাদ করেন।

নাজ্জারের মতে, এটি শুধু কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামও জড়িত। সমবায়ের বিক্রয়লব্ধ আয়ের ১৫ শতাংশ গ্রামের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়। দরিদ্র পরিবারগুলোকে নিজেদের জমিতে চাষে উৎসাহিত করার জন্য প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

নতুন সদস্যদের ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সেখানে দখলদারত্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি বা অ্যাগ্রোইকোলজির কৌশল শেখানো হয়।

জমির সঙ্গে মর্যাদার সম্পর্ক

নাজ্জারের হিসাবে জুলাইয়ের হামলাটি ছিল সমবায়ের গ্রিনহাউসে সপ্তম বড় ধরনের ভাঙচুর। তারপরও তারা বারবার ধ্বংস হওয়া স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করছেন।

তার কাছে জমি শুধু জীবিকার উৎস নয়, মর্যাদার প্রতীক। তিনি বলেন, সত্যিকারের দখল তখনই ঘটে, যখন কোনো মানুষ তার নিজের মনকে দখলদারত্বের কাছে সমর্পণ করে। সকালে নিজের জমিতে গিয়ে কাজ করাকেই তিনি প্রকৃত স্বাধীনতা হিসেবে দেখেন।

বুরিন ইৎজহার ও হার ব্রাখার মতো বসতিগুলোর মাঝখানে অবস্থিত। নাজ্জারের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এলাকায় ১৩টি বসতি বা আউটপোস্ট প্রতিষ্ঠা কিংবা সম্প্রসারিত হয়েছে।

তারপরও কৃষকেরা জমি ছাড়তে রাজি নন। ধ্বংস হওয়া গ্রিনহাউস পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি তারা নতুন একটি বেড়া তৈরির কাজ করছেন, যাতে ভবিষ্যতের হামলা অন্তত কিছুটা ঠেকানো যায়।

নাজ্জারের ভাষায়, আমরা আরেকটি নাকবার মেনে নেওয়ার চেয়ে নিজেদের জমিতে মৃত্যুবরণ করাকেই পছন্দ করি।

তাদের কাছে এই কৃষিকাজ কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়—এটি স্বাধীনতা ও নিজেদের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার লড়াই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়