spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

ঠিকানা বদলে ফেলছে প্রজাপতি

 জেড নিউজ , ডেস্ক :

একসময় বর্ষার পর গ্রামের পথ, ধানের খেতের আল কিংবা বাড়ির পাশের ঝোপঝাড়ে চোখ মেললেই দেখা মিলত নানা রঙের প্রজাপতি। হলুদ, নীল, সাদা কিংবা কমলা ডানায় তারা উড়ে বেড়াত ফুল থেকে ফুলে। শিশুরা ছুটত তাদের পেছনে, আর প্রকৃতির এ ক্ষুদ্র প্রাণীটি হয়ে উঠত ঋতু বদলের এক নীরব বার্তাবাহক।

পরিচিত সে দৃশ্য ধীরে ধীরেই বদলে যাচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, পরিবর্তন হচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন, হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক আবাসস্থল। আর এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রজাপতিরাও বদলাচ্ছে তাদের বসতি। কোনো প্রজাতি চলে যাচ্ছে নতুন এলাকায়, কোনোটি উঠছে পাহাড়ের উঁচু ঢালে, আবার কোনোটি তার পুরোনো আবাসস্থলের বড় অংশ হারিয়ে দিগভ্রান্ত।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক বৈশ্বিক গবেষণা সেই পরিবর্তনের পরিসরকে সামনে এনেছে। অস্ট্রেলিয়ার মনাশ ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. শাওয়ান চৌধুরী ও তার সহকর্মীদের পরিচালিত ‘এক্সটেনসিভ ক্লাইমেট-ইনডিউসড রেঞ্জ শিফটস ইন বাটারফ্লাইজ অ্যাক্রস দ্য গ্লোব’ শীর্ষক গবেষণাটি গত ৫ আগস্ট নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন জার্নালে প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের পরিচিত প্রজাপতির প্রজাতিগুলোর প্রতি ১০টির মধ্যে অন্তত একটি এরই মধ্যে তাদের বিস্তৃতির পরিসর বদলেছে। অর্থাৎ প্রজাপতির পৃথিবী আর আগের জায়গায় স্থির নেই।

প্রজাপতির স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি শুনলে প্রথমেই মনে হতে পারে—পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে, তাই তারা ঠাণ্ডা এলাকার দিকে সরে যাচ্ছে। বাস্তবতা অবশ্য এর চেয়ে অনেক জটিল। ৫৬৫টি গবেষণা ও ৬৮টি বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন থেকে ৬ হাজার ১৮০টির বেশি বিস্তৃতি পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে গবেষণায়। এতে ১০৫ দেশের ১ হাজার ৭৫৮টি প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দেখা গেছে, নথিভুক্ত প্রজাতিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে তাদের বিস্তৃতি বাড়িয়েছে। ২৭ শতাংশ প্রজাতির বিস্তৃতি কমেছে এবং ২২ শতাংশ পাহাড় বা ঢালের ওপর-নিচে তাদের অবস্থান বদলেছে। অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে একাধিক ধরনের পরিবর্তনও দেখা গেছে।

এর অর্থ হলো, প্রজাপতিরা শুধু উত্তর বা দক্ষিণে সরে যাচ্ছে না। কেউ পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত হচ্ছে, কেউ পাহাড়ের ওপরের দিকে যাচ্ছে, আবার কোনো প্রজাতি নিচের দিকে নেমে আসছে। কোথাও নতুন প্রজাতির আগমন ঘটছে, কোথাও পুরোনো প্রজাতির উপস্থিতি কমে যাচ্ছে।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার ঘটনাই প্রজাপতির বিস্তৃতি পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কৃষির সম্প্রসারণ, বন উজাড়, নগরায়ণ ও আবাসস্থল ধ্বংস।

প্রজাপতির জীবনচক্র অত্যন্ত নির্ভরশীল পরিবেশের ওপর। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির জন্য দরকার ফুলের মধু, আশ্রয় ও প্রজননের উপযোগী স্থান। আবার শুঁয়োপোকার খাদ্য হিসেবে অনেক প্রজাতি নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল।

ফলে কোনো এলাকায় তাপমাত্রা উপযোগী থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ না থাকলে প্রজাপতিটির পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। একইভাবে একটি বন বা ঘাসভূমি যদি ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন অংশে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে এক আবাসস্থল থেকে অন্য আবাসস্থলে যাতায়াত, প্রজনন ও নতুন এলাকায় বসতি স্থাপন বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ প্রজাপতির ঠিকানা বদলের গল্প আসলে একটি বৃহত্তর পরিবেশগত পরিবর্তনেরই গল্প।

পরিবর্তনের গতি বোঝাতে গবেষণায় বেশ কিছু উদাহরণ উঠে এসেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় টনি কস্টার নামের একটি প্রজাপতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত তার বিস্তৃতি বাড়িয়েছে। ব্রাজিলের একটি প্রজাতিও উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে নতুন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। আবার উল্টো চিত্রও রয়েছে। যুক্তরাজ্যে স্মল ব্লু প্রজাপতি গত দেড় শতকে তার আবাসস্থলের প্রায় ৪০ শতাংশ হারিয়েছে।

পাহাড়ি এলাকায়ও পরিবর্তনের গতি কম নয়। মেক্সিকোয় পেইন্টেড লেডি প্রজাপতি ১৯৮৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৮৩ মিটার হারে উঁচুতে উঠেছে। একই সময়ে কুইন বাটারফ্লাই প্রায় ৩২ মিটার হারে নিচের দিকে সরে গেছে। তাই প্রজাপতির বিস্তৃতি পরিবর্তনকে কেবল ‘উষ্ণতা থেকে পালিয়ে ঠাণ্ডা অঞ্চলে যাওয়া’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।

বাংলাদেশে প্রজাপতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও দেশব্যাপী পর্যবেক্ষণের তথ্য এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। কিন্তু দেশের পরিবেশে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে, তা প্রজাপতির আবাসস্থলের ওপরও প্রভাব ফেলছে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে উন্মুক্ত জায়গা, ঝোপঝাড় ও বাগান কমে যাচ্ছে। শহরের বাইরে কৃষিজমির ব্যবহার বদলাচ্ছে, জলাভূমি ভরাট হচ্ছে, বনাঞ্চল নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে, কোথাও নদীভাঙন ও ভূমির পরিবর্তন ঘটছে। এসব পরিবর্তনের প্রতিটিই ছোট ছোট প্রাণীর আবাসস্থলকে প্রভাবিত করতে পারে।

একটি প্রজাপতি হয়তো কয়েকটি গাছের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। সে গাছগুলো কোনো এলাকায় না থাকলে তাপমাত্রা উপযোগী হলেও প্রজাপতিটির জন্য জায়গাটি আর বাসযোগ্য থাকে না।

 কারণেই বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দেশে প্রজাপতির ওপর নিয়মিত নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মধুপুরের বনাঞ্চল, সিলেটের টিলা ও হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রতিবেশব্যবস্থায় কোন প্রজাতি কোথায় আছে, কোনটি কমছে এবং কোনটি নতুন এলাকায় দেখা যাচ্ছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা দরকার।

এখন মোটা দাগে প্রশ্ন জাগতে পারে—প্রজাপতি কমে গেলে বিপদটা কোথায়? আমাদের মনে রাখতে হবে প্রজাপতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, তারা বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি ফুলের মধু সংগ্রহের সময় পরাগায়নে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে তাদের শুঁয়োপোকা পাখি, মাকড়সা ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য। ফলে প্রজাপতির একটি প্রজাতির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।

এ কারণে প্রজাপতির সংখ্যা বা বিস্তৃতির পরিবর্তনকে শুধু একটি পোকামাকড়ের পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অনেক সময় পুরো বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের একটি সংকেত। আজ কোনো এলাকায় একটি প্রজাপতি নতুন করে দেখা গেল—এটি আনন্দের খবর হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সে ওখানে এসেছে কেন? নতুন পরিবেশে তার বিস্তৃতি বেড়েছে বলে? নাকি পুরোনো আবাসস্থল তার জন্য আর নিরাপদ নেই?

প্রজাপতির এ স্থান পরিবর্তন সংরক্ষণনীতির জন্যও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। কোনো প্রাণী ২০ বা ৩০ বছর আগে যে এলাকায় ছিল, সেটিকে কেন্দ্র করে যদি শুধু সংরক্ষণ পরিকল্পনা করা হয়, ভবিষ্যতে সে পরিকল্পনা যথেষ্ট নাও হতে পারে। কারণ প্রাণীরা বদলে যাওয়া জলবায়ুর সঙ্গে নিজেদের উপযোগী নতুন জায়গা খুঁজবে। কিন্তু সেই নতুন জায়গায় পৌঁছানোর পথ যদি শহর, সড়ক, কৃষিজমি বা ধ্বংস হওয়া বনাঞ্চলের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে প্রজাতিটির টিকে থাকাই হয়ে উঠবে কঠিন।

গবেষকদের মূল বার্তাটিও সেখানেই—সংরক্ষণ পরিকল্পনা শুধু অতীতে কোনো প্রজাতি কোথায় ছিল, সেটির ওপর নির্ভর করলে চলবে না; ভবিষ্যতে তারা কোথায় যেতে পারে, সেই জায়গা ও যাওয়ার পথও রক্ষা করতে হবে। প্রজাপতির ডানা খুবই ছোট। কিন্তু সে ডানার নড়াচড়া কখনো কখনো পৃথিবীর বড় পরিবর্তনের খবর বহন করে।

বিশ্বের মাত্র ১০ শতাংশ পরিচিত প্রজাতির প্রজাপতির তথ্য বিশ্লেষণ করেই যখন এত ব্যাপক পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তখন অজানা অঞ্চলগুলোর বাস্তবতা হয়তো আরো উদ্বেগজনক। বিশেষ করে মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, নিউগিনি ও আমাজনের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলে প্রজাপতি নিয়ে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশও সে বৃহত্তর এশীয় জীববৈচিত্র্য অঞ্চলের অংশ। তাই এখনই প্রজাপতির উপস্থিতি, বিস্তৃতি ও আবাসস্থল নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়