০৯/০৬/২০২৬, ২৩:৫১ অপরাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম

    জেড নিউজ , ঢাকা :

    এক সময় পৃথিবীর বহু সমাজে কন্যাসন্তান ছিল অবহেলা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে জাহেলি আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো।

    এমনকি অনেক নিষ্ঠুর পিতা নিজের নবজাতক কন্যাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিতেও দ্বিধা করত না। মানবতার ইতিহাসে এটি ছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ঠিক সেই অন্ধকার যুগেই ইসলাম এসে কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য বিপ্লব ঘটায়। যে কন্যাসন্তানকে সমাজ বোঝা মনে করত, ইসলাম তাকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত, ঘরের বরকত এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে।

    আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৪৯)

    লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে কন্যাসন্তানের কথা উল্লেখ করেছেন। মুফাসসিরগণ বলেন, এর মধ্যে কন্যাসন্তানের মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ যে সমাজ কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞা করত, আল্লাহ তাআলা সেই সমাজের ভুল ধারণাকে ভেঙে দিয়ে কন্যাসন্তানকে সম্মানিত করেছেন।

    ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যাসন্তান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মূল্যবান আমানত। তার সঠিক লালন-পালন, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দায়িত্ব পালন করলে তা পিতা-মাতার জন্য জান্নাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করবে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এভাবে একসঙ্গে থাকব।’ এরপর তিনি নিজের দুই আঙুল একত্র করে দেখালেন।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত : ২৬৩১)

    একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের সংবাদ আর কী হতে পারে! কন্যাসন্তানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে কিয়ামতের দিন সে মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করবে।

    অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার ঘরে কন্যাসন্তান আসে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৪১৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৬২৯)

    এ হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কন্যাসন্তান আল্লাহর রহমত এবং তাদের যথাযথ প্রতিপালন মহান সওয়াবের কাজ। অথচ জাহেলি যুগের মানুষ কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদ শুনে লজ্জা ও দুঃখে ভেঙে পড়ত। আল্লাহ তাআলা তাদের সেই মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে দুঃখে কাতর থাকত।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৫৮)

    দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক যুগেও অনেক সমাজে সেই জাহেলি মানসিকতার কিছু না কিছু ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও কন্যাসন্তানের জন্মে আনন্দের পরিবর্তে হতাশা দেখা যায়, কোথাও তাকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, কোথাও আবার উত্তরাধিকার ও সম্পদের ন্যায্য অধিকার থেকেও দূরে রাখা হয়। এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মহানবী (সা.) নিজের জীবনে কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে সাদরে গ্রহণ করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় বসাতেন।’ (আবু দাউদ, আয়াত : ৫২১৭)

    এটি শুধু একজন পিতার ভালোবাসা ছিল না; বরং সমগ্র উম্মতের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা ছিল যে, কন্যাসন্তান সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসার পূর্ণ অধিকারী। তবে কন্যাসন্তানের হক আদায় শুধু খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, উত্তম চরিত্র গঠনে সহায়তা করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করা এবং সমাজের উপকারী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলাও পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব।

    প্রখ্যাত ইসলামী মনীষী ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। তার হৃদয় নিষ্পাপ ও নির্মল ভূমির মতো; তাকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে, সে সেভাবেই বেড়ে উঠবে।

    প্রকৃতপক্ষে একজন কন্যাসন্তানকে সৎ, শিক্ষিত, আদর্শবান ও দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা মানে শুধু একজন মানুষকে গড়ে তোলা নয়; বরং একটি সুন্দর পরিবার, একটি আদর্শ সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা। কারণ একজন মা-ই একটি জাতির প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

    তাই কন্যাসন্তানের জন্মে হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক মূল্যবান নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়