জেড নিউজ , ঢাকা :
হজ আল্লাহতায়ালার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, নিরঙ্কুশ আনুগত্য এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য ইবাদত। এই মহান ইবাদতের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ তাদের ঐতিহ্য, আত্মত্যাগের শিক্ষা এবং আল্লাহতায়ালার প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের অঙ্গীকারকে নতুন করে স্মরণ করেন।
হজ সবার ওপর ফরজ নয়, বরং আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান লোকদের ওপর জীবনে একবার ফরজ হয়। যারা প্রথমবার ফরজ হজ আদায় করতে যান তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। তাই বিশেষভাবে তাদের জন্য হজের দিনগুলোতে হজের আমল ও বিধিবিধান সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।
হজের ফরজ সমূহ : হজের ফরজ চারটি।
এক. হজের নিয়তে ইহরাম পরিধান করা এবং তালবিয়া তথা ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’ পাঠ করা (একবার)।
দুই. ৯ জিলহজ আরাফায় (কিছু সময়ের জন্য) অবস্থান করা (রাত বা দিনে যদি অবস্থান করতে না পারেন তবে তার হজ হবে না)।
তিন. তাওয়াফে জিয়ারত বা ফরজ তাওয়াফ (প্রথম চার চক্কর ফরজ ও পরের তিন চক্কর ওয়াজিব)।
চার. এ ফরজগুলো সুনির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে ধারাবাহিকভাবে করা।
হজের ওয়াজিব সমূহ : হজের ওয়াজিব নয়টি।
এক. সাফা মারওয়ার মধ্যে দ্রুত চলা।
দুই. মুজদালিফায় অবস্থান করা। ৯ জিলহজ (আরাফাতে অবস্থানের দিন) দিবাগত রাতের যে কোনো সময় মুজদালিফায় পৌঁছা এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করা।
তিন. শয়তানের স্তম্ভে (জামারাত) পাথর নিক্ষেপ করা (যা রমি নামে পরিচিত)।
চার. মক্কার চারপাশে ইহরাম পরিধানের যে নির্দিষ্ট স্থান সে পরিসীমার বাইরে যাদের অবস্থান তাদের জন্য মক্কা শরিফে প্রবেশের পর সর্বপ্রথম কাবা জিয়ারত করা। বাংলাদেশের হাজিদের জন্যও এটা ওয়াজিব (তাওয়াফে কুদুম)।
পাঁচ. বিদায়ী তাওয়াফ করা (কাবা থেকে শেষ বিদায়ের সময় হজ থেকে ফেরার দিন তাওয়াফ করা, এটা বহিরাগত হাজিদের জন্য ওয়াজিব। সুতরাং বাংলাদেশি হাজিদের জন্যও ওয়াজিব)।
ছয়. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা। (ইহরাম মুক্ত হয়ে মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছাঁটা যাবে, নচেৎ নয়)। ১০ জিলহজ শয়তানের বড় স্তম্ভে (জামারাতে উকবা) পাথর মারার পর মাথা মুণ্ডন করা বা চুল খাটো করে নেওয়া।
সাত. কোরবানি দেওয়া (বহিরাগত হাজিদের জন্য এটা ওয়াজিব)।
আট. দুই নামাজ একত্রে পড়া (আরাফায় জোহর-আসর এবং মুজদালিফায় মাগরিব-এশা)।
নয়. পাথর মারা (রমি) এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছাঁটা ধারাবাহিকভাবে করা।
ইহরামের আগে যা যা করবেন : ইহরাম বাঁধার আগেই গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা, গোসল করে পাক হয়ে যাওয়া আবশ্যক। এমনকি ঋতুবর্তী নারীদেরও এ সময় গোসল করা মুস্তাহাব। সুগন্ধি ব্যবহার করাও মুস্তাহাব। এ বিষয়ে হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি নিজে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইহরাম বাঁধার আগে তাকে সুগন্ধি মাখিয়ে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি) তবে ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষেধ।
ইহরাম বাঁধার নিয়ম
এক. প্রথমেই পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য গোসল করা। গোসল করা সম্ভব না হলে অজু করা। চুল কাটার প্রয়োজন না হলে চিরুনি দিয়ে চুলগুলো পরিপাটি করে নেওয়া।
দুই. গোসলের পর সেলাইহিবীন দুটি কাপড় পরিধান করা। একটি হলো ইজার তথা লুঙ্গি, অন্যটি লেফাফা তথা চাদর।
তিন. মিকাতের নির্ধারিত স্থানে অথবা মিকাতের নির্ধারিত স্থানের আগেই ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা। নামাজের প্রথম রাকাতে সুরা ফাতিহার পর সুরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়া মুস্তাহাব। নামাজের সময় মাথায় টুপি থাকবে, নামাজ শেষে নিয়তের আগেই টুপি খুলে ফেলা।
চার. ইহরামের নিয়ত করা। যদি ওমরাহর জন্য ইহরাম হয় তাহলে বলবেন, ‘লাব্বাইক ওমরাতান’ আর যদি ইহরাম হজের জন্য হয় তাহলে বলবেন, ‘লাব্বাইক হাজ্জান’।
পাঁচ. ইহরামের নিয়তের পর পরই উচ্চৈঃস্বরে চার ভাগে (প্রত্যেক ভাগ এক নিঃশ্বাসে) তালবিয়া পাঠ করা (৩ বার)।
১ম ভাগ. লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। ২য় ভাগ. লাব্বাইক, লা-শারিকা-লাকা লাব্বাইক। ৩য় ভাগ. ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল-মুলক। ৪র্থ ভাগ. লা শারিকা লাক।
উচ্চৈঃস্বরে চার ভাগে (প্রত্যেক ভাগ এক নিঃশ্বাসে) তিনবার তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে ইহরাম বাঁধার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যায়। তখন থেকে ইহরামকারীর জন্য হজ ও ওমরাহর কার্যক্রম ছাড়া স্বাভাবিক সময়ের বৈধ কাজও হারাম হয়ে যায়।
ইহরাম বাধার পর হজ বা ওমরাহ পালনে ইচ্ছুকগণ বেশি বেশি তালবিয়া, দরুদ এবং নিজেদের ইচ্ছামতো দোয়া পাঠ করবে। ইহরাম বাধার পর এ দোয়া পাঠ করাও সুন্নাত, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা রিজাকা ওয়াল জান্নাতা ওয়া আউ’জুবিকা মিন গাজাবিকা ওয়ান্নারি।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের আশা করছি এবং আপনার অসন্তুষ্টি ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
হজসংশ্লিষ্ট কাজের বর্ণনা
এক. মিকাতের আগে (সম্ভব হলে বিমানে আরোহণের আগে) ইহরাম বাঁধা।
দুই. মক্কায় পৌঁছে জিনিসপত্র নিজ নিজ কক্ষে রেখে অজু করে মুয়াল্লিমের সঙ্গে কাবা শরিফে যাওয়া।
তিন. কাবা তাওয়াফ করা তথা সাতবার কাবা প্রদক্ষিণ করা, পারলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা, সম্ভব না হলে হাতে ইশারা করে তাওয়াফ শুরু করা।
চার. কাবা ঘরকে সাত চক্কর দ্রুত প্রদক্ষিণ করা (রমল)।
তাওয়াফের সময় ইহরামের চাদর ডান হাতের নিচ দিয়ে এনে বাঁ কাঁধে রাখতে হবে, যেন ডান কাঁধ ও বাহু উন্মুক্ত হয়ে থাকে (ইজতিবাহ)। এ দুটি আমল তাওয়াফের সুন্নাত, যা তাওয়াফে জিয়ারত ও ওমরাহর সময়ও করা সুন্নত। পাঁচ. সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করা বা দৌড়াতে হবে সাতবার। শুরু হবে সাফা পর্বত থেকে, শেষ করতে হবে মারওয়ায় গিয়ে। ছয়. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছাঁটানো। এসব সম্পাদনের পর হজের দিন কয়েক বাকি থাকলে ইহরাম মুক্ত হয়ে মদিনা শরিফ যাওয়া যায়। হজের আগে ইহরাম থেকে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করাকে হজে তামাত্তু বলা হয়।



