spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

সাড়ে তিন হাজার বছরের সৌন্দর্য, অসমাপ্ত এক চোখ

জেড নিউজ, ডেস্ক :   

প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে ইতিহাসের বহু উত্থান-পতন পেরিয়ে আজও যে মুখটি মানুষকে থমকে দাঁড় করায়, তার নাম নেফারতিতি। সরু লম্বা গলা, উঁচু গালের হাড়, সুঠাম মুখাবয়ব, নীল মুকুট আর ঠোঁটের সূক্ষ্ম রেখা—প্রাচীন মিসরের এ রানি যেন পাথরের শরীরে আটকে রেখেছেন সময়কে। অথচ বিখ্যাত প্রতিকৃতিটির সবচেয়ে রহস্যময় দিকটি হলো, তার একটি চোখ আজও অসম্পূর্ণ।

বার্লিনের নয়ে‌স মিউজিয়ামে রাখা নেফারতিতির এ আবক্ষ ভাস্কর্যটি তৈরি হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩৪০ সালে। চুনাপাথরের ওপর সূক্ষ্ম প্লাস্টারের আস্তরণ দিয়ে তৈরি, রঙিন এ ভাস্কর্যের শিল্পী হিসেবে পরিচিত থুতমোস। এটি প্রাচীন মিসরের অষ্টাদশ রাজবংশের আমরনা যুগের শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

ভাস্কর্যটির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে তার অসাধারণ স্বাভাবিকতা। প্রচলিত মিসরীয় রাজকীয় ভাস্কর্যের মতো কেবল আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী নয়; মুখের গড়নে রয়েছে কোমলতা, ত্বকের ওপর আছে আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম খেলা, গালের হাড় ও চোয়ালের রেখায় মানবদেহের বাস্তব উপস্থিতি। মাথার মুকুট থেকে চিবুক, তারপর দীর্ঘ গলা—সবকিছু মিলিয়ে ভাস্কর্যটির রেখাগুলো যেন একটি ধারাবাহিক জ্যামিতিক ছন্দ তৈরি করেছে।

এ সৌন্দর্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি অসম্পূর্ণতা। রক ক্রিস্টালের তৈরি ডান চোখ, যার মণি কালো মোমজাতীয় উপাদান দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। অন্যদিকে বাম চোখের কোটরটি খালি। দীর্ঘদিন ধরে এ অসম্পূর্ণ চোখকে ঘিরে একটি ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল, এটি নাকি শিল্পীর কর্মশালায় ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি ‘মডেল’। অর্থাৎ চূড়ান্ত ভাস্কর্য তৈরির আগে শিল্পী ও তার সহকারীরা মুখটিকে ত্রিমাত্রিক নকশা বা আদর্শ নমুনা হিসেবে ব্যবহার করতেন।

নেফারতিতির আবক্ষ ভাস্কর্যটি সত্যিই কেবল একটি কর্মশালার মডেল ছিল কিনা, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই। বার্লিনের স্টেট মিউজিয়ামের গবেষকদের মতে, ভাস্কর্যটি এতটাই নিখুঁতভাবে রঙ করা এবং সম্পন্ন যে এটিকে শুধু একটি অসমাপ্ত কর্মশালা-মডেল হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন

এ ধারণার পেছনে যুক্তিও আছে। ১৯১২ সালে জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক লুডভিগ বোরখার্ডের নেতৃত্বে আমরনায় খননকাজের সময় ভাস্কর্যটি পাওয়া যায় শিল্পী থুতমোসের কর্মশালায়। সেখানে নেফারতিতি ও রাজপরিবারের আরো কয়েকটি প্রতিকৃতি এবং ভাস্কর্যের কাজের সঙ্গে যুক্ত নানা নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। সে কর্মশালার পরিবেশই ভাস্কর্যটিকে ‘মডেল’ হিসেবে দেখার ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল।

তবে ইতিহাসের এ জায়গাতেই গল্পটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ নেফারতিতির আবক্ষ ভাস্কর্যটি সত্যিই কেবল একটি কর্মশালার মডেল ছিল কিনা, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই। বার্লিনের স্টেট মিউজিয়ামের গবেষকদের মতে, ভাস্কর্যটি এতটাই নিখুঁতভাবে রঙ করা এবং সম্পন্ন যে এটিকে শুধু একটি অসমাপ্ত কর্মশালা-মডেল হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। প্রাচীন মিসরে আবক্ষ ভাস্কর্য নিজেই একটি স্বতন্ত্র শিল্পরীতি ছিল। ফলে এটি মডেল, নাকি প্রায় সম্পূর্ণ একটি শিল্পকর্ম—রহস্যটি এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আর এ রহস্যই যেন নেফারতিতির মুখটিকে আরো জীবন্ত করে তুলেছে।

নেফারতিতির প্রতিকৃতি শুধু একজন রানির মুখচ্ছবি নয়; এটি প্রাচীন মিসরের শিল্প-ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের দলিল। তিনি ছিলেন ফারাও আখেনাতেনের স্ত্রী। আখেনাতেনের শাসনামলে মিসরের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোয় এসেছিল বড় পরিবর্তন। প্রচলিত বহু দেবতার পরিবর্তে সূর্যচক্র ‘আতেন’-কেন্দ্রিক ধর্মীয় ভাবনা সামনে আসে এবং রাজধানী স্থানান্তর করে নতুন নগরী আখেতাতেন (বর্তমান আমরনা) গড়ে তোলা হয়। এ পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পেও আসে নতুন ভাষা।

রাজপরিবারের মানুষদের আগের মতো কেবল আদর্শ, কঠোর ও আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে দেখানোর বদলে তাদের শরীর ও মুখাবয়বে মানবিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা শুরু হয়। আখেনাতেন, নেফারতিতি এবং তাদের সন্তানদের চিত্রণে দেখা যায় বেশি স্বাভাবিকতা, আবেগ ও শারীরিক বৈচিত্র্য। নেফারতিতির এ আবক্ষ ভাস্কর্য সে পরিবর্তনের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। তার সৌন্দর্য এখানে কেবল রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক নয়; বরং একটি নতুন নান্দনিক আদর্শের প্রকাশ।

নেফারতিতির ইতিহাসও তার ভাস্কর্যের মতোই রহস্যে ঘেরা। আখেনাতেনের স্ত্রী হলেও তার রাজনৈতিক ভূমিকা কতটা বিস্তৃত ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। আমরনা যুগের বিভিন্ন শিল্পকর্মে তাকে এমন সব রাজকীয় প্রতীক ও ভঙ্গিতে দেখা যায়, যা কেবল একজন ফারাওয়ের স্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকার চেয়ে বেশি ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। স্মার্টহিস্টোরির বিশ্লেষণেও তাকে এমন এক শক্তিশালী নারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যিনি সম্ভবত আখেনাতেনের সঙ্গে ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভাগ করে নিয়েছিলেন।

এসময় আখেনাতেনের মা তিয়ে এবং স্ত্রী নেফারতিতি—দুই নারীই রাজপরিবারের দৃশ্যমান ক্ষমতার কাঠামোয় বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ফলে নেফারতিতির মুখের সৌন্দর্যের আড়ালে প্রাচীন মিসরের রাজনীতি ও ক্ষমতার ইতিহাসও লুকিয়ে আছে।

আখেনাতেনের স্ত্রী হলেও নেফারতিতির রাজনৈতিক ভূমিকা কতটা বিস্তৃত ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। আমরনা যুগের বিভিন্ন শিল্পকর্মে তাকে এমন সব রাজকীয় প্রতীক ও ভঙ্গিতে দেখা যায়, যা কেবল একজন ফারাওয়ের স্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকার চেয়ে বেশি ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়

আমরনায় খননের সময় ১৯১২ সালে আবিষ্কৃত হওয়ার পর ভাস্কর্যটি জার্মানিতে নিয়ে যাওয়া হয়। জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক লুডভিগ বোরখার্ড্টের নেতৃত্বে পরিচালিত খনন থেকে এটি জার্মানির সংগ্রহে আসে। তবে এ হস্তান্তরের বৈধতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে পরবর্তী সময়ে মিসর ও জার্মানির মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক তৈরি হয়। মিসর বহুবার ভাস্কর্যটি ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়েছে; জার্মান পক্ষ অবশ্য এটিকে বৈধভাবে অর্জিত প্রত্ননিদর্শন হিসেবে ধরে রেখেছে।

সংস্কারের পর বার্লিনের নয়ে‌স মিউজিয়াম ২০০৯ সালে পুনরায় খুললে নেফারতিতির আবক্ষ ভাস্কর্যটিকে সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রদর্শন করা হয়। বিশাল গম্বুজের নিচে প্রায় এককভাবে প্রদর্শিত মুখটি দর্শনার্থীর চোখের সামান্য ওপরে রাখা হয়েছে। ফলে দর্শককে স্বাভাবিকভাবেই একটু মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকাতে হয়, যেন তিন হাজার বছর পরও তিনি রাজকীয় উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছেন।

কিন্তু এ প্রদর্শনীর সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে আরেকটি প্রশ্ন—একটি দেশের মাটিতে জন্ম নেয়া সাংস্কৃতিক স্মৃতি অন্য দেশের জাদুঘরে কতটা ‘নিজস্ব’ হয়ে উঠতে পারে? নেফারতিতির ভাস্কর্য এখন আর শুধু শিল্পের বিষয় নয়। এটি প্রত্নসম্পদের মালিকানা, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, প্রত্নবস্তু ফেরত দেয়া এবং জাদুঘরের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জার্মান দুই শিল্পী নোরা আল-বদরি ও ইয়ান নিকোলাই নেলেস ২০১৬ সালে গোপনে একটি থ্রিডি স্ক্যানার ব্যবহার করে ভাস্কর্যটির ডিজিটাল তথ্য ধারণ করেন এবং পরে তা উন্মুক্ত করেন। ‘নেফারতিতি-হ্যাক’ নামে পরিচিত এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল প্রত্নসম্পদের ওপর প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ডিজিটাল প্রবেশাধিকার নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা। এখানেই নেফারতিতির মুখের গল্পটি সাড়ে তিন হাজার বছর পেরিয়ে আধুনিক পৃথিবীর একেবারে নতুন প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়