আমিরুল ইসলাম কাগজী
একটি জাতির ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে—যেগুলো কেবল সময়ের পাতায় লেখা থাকে না, মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা তেমনই এক মুহূর্ত। সর্বোচ্চ সম্মান, বিপুল জনসমাগম এবং নিঃশব্দ অশ্রুতে ভেজা আকাশ যেন বলে দিচ্ছিল—এটি কোনো সাধারণ বিদায় নয়, এটি একটি যুগের সমাপ্তি, সমাপ্তি একটি মহাকাব্যের। তিনি আজ অমর অজর অক্ষয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাযা ধরা হয়ে থাকে ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির। আর ২০২৫ এর বিদায় বেলায় বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় গুগলের হিসাব মতে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মানিক মিয়া এভিনিউতে প্রায় ২৪ লাখ লোকের সমাগম ঘটেছে। কিন্তু এ আই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বলা হয়েছে সেটা এক কোটি ৪০ থেকে ৫০ লাখের সমান। ১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজায় ২০ লাখ লোকের সমাগম ঘটেছিল। তবে খালেদা জিয়ার সমাবেশে আগত মানুষের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না।এটি ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং সম্মানের প্রতীক। আগের রাত থেকে শুরু করে সেই গ্রাম গঞ্জ থেকে মানুষ এসেছে গাড়িতে চড়ে, ঢাকার আশেপাশের লোক এসেছে পায়ে হেঁটে সকাল থেকে। এতটুকু ক্লান্তি নেই কারোর মনে।
সকাল ১০ টা থেকে কিম্বা বলা যায় তারও আগে থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সবাই সেই বিকাল ৫ টা পর্যন্ত। তাই এই জানাজা কে বলা যায় ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্মৃতি আর প্রত্যাশার সমবেত বিস্ফোরণ। ইতিহাস বহু নেতার জানাজা দেখেছে, কিন্তু খুব কম জানাজাই একটি জাতির সম্মিলিত অনুভূতির এমন প্রবল বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পেরেছে। সেই অর্থে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ছিল ইতিহাসেরই এক অনিবার্য অধ্যায়।
খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি ধারার নাম, একটি আদর্শের প্রতিনিধি,একটি সংগ্রামের প্রতীক। তিনি যখন রাজনীতিতে পদার্পণ করেন তখন জাতির কাঁধে চেপে বসেছে এরশাদ সামরিক শাসন। সেই সামরিক শাসন পরবর্তী বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেই পথে তিনি ছিলেন এক অবিচল যাত্রী। তার সহযাত্রী ছিলেন বিপরীত মেরুর প্রতিনিধি-লোভী এবং হিংসুটে।রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কারাবরণ, অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত বেদনা—কোনো কিছুই তাকে তার রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এই অনমনীয়তাই তাকে পরিণত করেছিল লাখো মানুষের আশা-ভরসার প্রতীকে। রাতারাতি তিনি হয়ে উঠলেন আপসহীন নেত্রী।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও অন্যায় অসৎ দাবির কাছে মাথা নত করেননি তিনি। তাইতো বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন ন্যায়ের প্রতীক , যাকে বিশ্বাস করা যায় যুক্তিহীন ভাবে ভালোবাসা যায় নিঃশর্তভাবে, শ্রদ্ধা করা যায় মাতৃত্বের উচ্চ আসনে রেখে।
তাইতো তার জানাজার মাঠে যে জনস্রোত নেমেছিল, সেখানে কেবল দলীয় নেতাকর্মী ছিল না। ছিল গ্রামের কৃষক, শহরের শ্রমজীবী মানুষ, বৃদ্ধ মা, তরুণ শিক্ষার্থী—যারা হয়তো রাজনীতির ভাষায় দক্ষ নয়, কিন্তু অনুভবের ভাষায় জানে, কে তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। সেই মাঠে দাঁড়িয়ে মানুষ যেন বলছিল—“আমরা শুধু একজন নেত্রীকে নয়, আমাদের সময়ের এক সাহসী অধ্যায়কে বিদায় জানাতে এসেছি।”
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানে তার বিদায় ছিল এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বহু মতভেদ, বহু সংঘাতের পরও রাষ্ট্র স্বীকার করেছে—ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এমন এক নাম, যাকে বাদ দিয়ে আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা অসম্ভব। এই স্বীকৃতি শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়, গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতার প্রতিও এক ধরনের নীরব সম্মান।
এই জানাজা প্রমাণ করেছে—জনগণের হৃদয় আদালতের রায়ে চলে না, প্রশাসনিক নোটিশে আবদ্ধ থাকে না। মানুষের ভালোবাসা তৈরি হয় দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থেকে, সংগ্রামের স্মৃতি থেকে, বিশ্বাসের বন্ধন থেকে। তাই যখন বলা হয়, “ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকলো তার জানাজা”—তা কোনো অলংকার নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতার উচ্চারণ।
খালেদা জিয়ার জীবন ছিল দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। ক্ষমতা ও বিরোধিতা—উভয় অবস্থানেই তিনি ছিলেন সমানভাবে প্রভাবশালী। কখনো আপসহীন, কখনো নীরব, আবার কখনো বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত—তার রাজনৈতিক উপস্থিতি কখনোই হালকা ছিল না। এই তীব্রতাই তাকে ভালোবাসা ও বিরোধিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে এসে সেই বিভাজন যেন ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু একজন মানুষকে নয়, একজন মায়ের মতো, একজন অভিভাবকের মতো নেত্রীকে স্মরণ করেছে।
এই বিদায় নতুন প্রশ্নও রেখে যায়। একটি জাতি তার অতীতকে কীভাবে স্মরণ করে? আমরা কি আমাদের নেতাদের কেবল ক্ষমতার পালাবদলের হিসাবেই বিচার করবো, নাকি তাদের সংগ্রাম, ত্যাগ ও প্রভাবকেও ইতিহাসের মর্যাদা দেবো? বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা যেন সেই প্রশ্নগুলোর সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কোটি মানুষের উপস্থিতি আসলে ভবিষ্যতের জন্য এক নীরব বার্তা। এটি বলে দেয়—বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো আবেগহীন নয়, এখনো মানুষ নেতৃত্বের মধ্যে নিজেদের গল্প খোঁজে। এই জনসমাগম রাজনীতিবিদদের জন্য এক সতর্ক সংকেতও—জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে হলে ক্ষমতার চেয়ার নয়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়।
শেষ পর্যন্ত, বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় আমাদের শিখিয়ে যায়—মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায়। একটি জীবন শেষ হয়, কিন্তু ইতিহাস চলতে থাকে। তার জানাজা সেই চলমান ইতিহাসের এক উজ্জ্বল, বেদনাবিধুর এবং গর্বিত অধ্যায়।
খালেদা জিয়া আজ নেই, কিন্তু তার নাম উচ্চারিত হবে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে, মানুষের স্মৃতিতে, আর সেই বিশাল জানাজার গল্পে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বলে যাবে—একদিন একজন নারী ছিলেন, যিনি নিজের জীবন দিয়ে একটি সময়কে সংজ্ঞায়িত করে গেছেন।



