spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

দেশের প্রতিটি গ্রাম ও ইউনিয়ন নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে: প্রধানমন্ত্রী

জেড নিউজ, ঢাকা

প্রথমেই আপনাদেরকে জানাই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের শুভেচ্ছা। ঐতিহাসিক এই দিনে নতুন পেশাগত পরিচয়ে আপনারা আজকের এই মহাসমাবেশে হাজির হয়েছেন। দফাদার কিংবা মহল্লাদার নয়…। এখন থেকে আপনাদের পেশাগত পরিচয় ‘গ্রাম পুলিশ’। সরকারিভাবে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মহল্লাদার’ হচ্ছেন ‘গ্রাম পুলিশ’ এবং দফাদার হচ্ছেন ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’। সুতরাং, ‘গ্রাম পুলিশে’র এই সমাবেশে আপনাদেরকে অভিনন্দন।

জনগণের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আপনারা বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখছেন এবং রাখবেন। তৃণমূলের কোথায় কি ঘটছে, কারা কোন অপরাধে যুক্ত হচ্ছে, কোথায় পরিস্থিতি অবনতির আশংকা রয়েছে, আপনারা নিজ নিজ ইউনিয়ন বা এলাকায় দায়িত্ব পালনের কারণে সে সব তথ্য কিছুটা আগেভাগেই আপনাদের জানার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং, যে কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতির ব্যাপারে আপনারা স্থানীয় প্রশাসন বিশেষ করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে গ্রাম বা ইউনিয়নের জনগণের নিরাপত্তা বিধানে আপনারা তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখতে পারেন।

আমি বিশ্বাস করি, দেশের প্রতিটি গ্রাম প্রতিটি ইউনিয়ন নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে। তৃণমূল জনগোষ্ঠী শান্তি ও স্বস্তিতে থাকলে বাংলাদেশ স্বস্তিতে থাকবে। সুতরাং, তৃণমূল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখার ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে আপনাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরায়ণ বা নগরায়ন ঘটলেও/ এখনো গ্রামেই কিন্তু দেশের অধিকাংশ জনগণের শেকড়। আমাদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এখনো সবকিছুই গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বা উঠছে। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপত্তা বিধানের প্রাথমিক সেই দায়িত্বটি আপনাদেরকে আরো নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে।

গ্রাম পুলিশের প্রিয় সদস্যবৃন্দ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশে শুধু রাজনৈতিক অবস্থা বাবস্থাকেই ধ্বংস করে দেয়া হয়নি, রাষ্ট্র ও সমাজে চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয়ও ঘটেছে।
পরিকল্পিতভাবে হীন স্বার্থ এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব উস্কে দিয়ে বাংলাদেশের আবহমানকালের বিরাজমান সৌহার্দ, সম্প্রীতি, সহমর্মিতার মূল্যবোধকেও বিনষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখতে এমনকি পরিবারে-পরিবারে পর্যন্ত বিরোধ বিবাদ উস্কে দেয়া হয়েছে। তৃণমূলেও প্রতিশোধ প্রতিহিংসা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

এমন একটি সামাজিক বাস্তবতায়, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলাবাহিনী দিয়েই পরিস্থিতির উন্নয়ন একমাত্র উপায় বলে আমি মনে করিনা। বরং, আমি মনে করি, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সক্রিয় কার্যক্রমের পাশাপাশি

ধর্মীয়-সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, এবং মানুষে মানুষে সামাজিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে/ সমাজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অন্যতম একটি কার্যকর উপায়।

সমাজে সৌহার্দ সম্প্রীতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত হলে সামাজিক অপরাধের মাত্রা অনেক কমে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এক্ষেত্রে সরকারের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে গ্রাম পুলিশের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে মনে রাখবেন, সকল ক্ষেত্রেই আপনাদের ভূমিকা হতে হবে আইনসম্মত, মানবিক, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব।

একটি নিরাপদ ইউনিয়ন বা গ্রামের জন্য কার্যকর স্থানীয় প্রশাসন, দায়িত্বশীল গ্রাম পুলিশ, এবং সচেতন জনগনের সক্রিয়তা, এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় জরুরি। এই সমন্বয় যত কার্যকর এবং শক্তিশালী হবে, দেশের ইউনিয়ন কিংবা গ্রামগুলোও তত বেশি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতেও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ক্ষেত্রে গ্রাম পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আপনাদের কাজগুলো হয়তো সব সময় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। তবে মনে রাখবেন, তাৎক্ষণিকভাবে আপনাদের একটি বিচক্ষণ এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।

তৃণমূলে আপনাদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে এতক্ষন আপনাদেরকে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে আপনারাও যাতে পরিবার পরিজন নিয়ে কিছুটা স্বচ্ছল জীবন পরিচালনা করতে পারেন, ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে একটু হলেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, সেদিকেও সরকারের নজর রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো গ্রাম পুলিশের জন্য ঈদ বোনাস প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল এবং ঘোষণা কার্যকর করা হয়েছিল।

একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও সারাদেশে কর্মরত ৪০ হাজারের বেশি গ্রাম পুলিশের পরিবার পরিজনের স্বাচ্ছন্দ জীবন জীবিকার জন্য কয়েকটি গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আপনাদের পদবি পরিবর্তন করে গ্রাম পুলিশ’ করা হয়েছে। তবে শুধু ‘পদবি’ পরিবর্তন নয়, আপনার জেনে খুশি হবেন গ্রাম পুলিশের বেতন ভাতাও বাড়ানো হয়েছে ।
আমি ঘোষনা দিচ্ছি, আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর থেকেই সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ইনশাআল্লাহ।
বেতন ভাতা ছাড়াও আপনাদের জন্য আরো কয়েকটি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বর্তমানে ‘গ্রাম পুলিশের’ মাসিক বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা। এই বেতন বাড়িয়ে ১০ দশ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রাম পুলিশ প্রধানে’র বর্তমান বেতন ৮ হাজার টাকা। এই বেতন বাড়িয়ে সাড়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। মাসিক বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি অবসরকালীন বিদ্যমান আনুতোষিক ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। ‘গ্রাম পুলিশে’র জন্য আনুতোষিক ভাতা ৭০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানে’র আনুতোষিক ভাতা ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লক্ষ টাকা করা হয়েছে।

তথ্য আদান প্রদানের জন্য ‘গ্রাম পুলিশ’কে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে হয়। এ কারণে সরকার প্রতিজন ‘গ্রাম পুলিশ’ সদস্যকে মোবাইলে ফোনের খরচের জন্য
মাসিক ২ শত টাকা করে প্রদান করবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে ‘গ্রাম পুলিশ’কে স্থানীয় থানায় যাওয়া আসা যাওয়া করতে হয়। থানায় প্রতি সপ্তাহে হাজিরার জন্য ‘গ্রাম পুলিশ’ সদস্যগণ বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ৩ শত টাকা পেয়ে থাকেন। বর্তমান সরকার থানায় যাতায়াত ভাড়া প্রতি সপ্তাহে আরো ২শত টাকা বাড়িয়ে ৫ শত টাকা নির্ধারণ করেছে। ‘গ্রাম পুলিশ প্রধানে’র থানায় যাতায়াত ভাতা বর্তমানে ৩ শত টাকা এর পরিবর্তে আরো বাড়িয়ে ৬শ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। রাষ্ট্র এবং সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে নারীর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। সরকার ইতোমধ্যেই সারাদেশে ১ লক্ষ ‘হেলথ ওয়ার্কার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরমধ্যে ৮০ হাজার হবেন নারী ‘হেলথ ওয়ার্কার’। এর পাশাপাশি আজ আমি ঘোষণা দিচ্ছি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে/ দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নতুনভাবে আরো ২ জন নারী ‘গ্রাম পুলিশ’ নিয়োগ করা হবে। নারী পুলিশদেরকে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হবে।

‘গ্রাম পুলিশে’র কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনায়/ প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ রাস্তা ‘গ্রাম পুলিশ সড়ক’ নামে নামকরণ করা হবে। সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের আওতায় এনে ‘গ্রাম পুলিশ সড়কে’ বৃক্ষরোপণ করা হবে। গাছ পরিণত হলে ওইসব গাছ বিক্রি করে বিক্রিলব্ধ অর্থ ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
এভাবেই সকল ক্ষেত্রে আমরা স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারি।

তৃণমূল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থেই সরকার গ্রাম পুলিশের স্বার্থ রক্ষায় এসব উদ্যোগবাস্তবায়ন করছে। বর্তমান সরকার একটি নিরাপদ স্বনির্ভর কল্যানমুলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকার সাধ্য এবং সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিটি শ্রেণী পেশার নাগরিককে সহায়তা দিতে বদ্ধ পরিকর। অপরদিকে সরকার আশা করে নাগরিকগণও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের মধ্যকার এই বোঝাপড়া এবং রাষ্ট্র ও নাগরিক একের প্রতি অন্যের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে উঠবে… ইনশাআল্লাহ।

উপস্থিত গ্রাম পুলিশ প্রধান এবং গ্রাম পুলিশ সদস্যবৃন্দ আপনারা প্রত্যেকেই যার যার ইউনিয়নের মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আরো একটি বিষয়ের প্রতি আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, সেটি হলো, আপনি আপনার ঘর, ঘরের আশপাশ হাটবাজার-রাস্তাঘাট-খালের দু’পাশ অর্থাৎ আপনার চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করুন। নিজেও যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। অন্যকেও যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলতে নিরুৎসাহিত করুন। সুযোগ পেলে নিজে স্বেচ্ছায় বৃক্ষ রোপন করুন। অন্যকেও বৃক্ষ রোপনে উৎসাহিত করুন। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যআমরা নিশ্চিত করতে পারবো একটি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ : সবুজ ও পরিচ্ছন্ন দেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়