জেড নিউজ স্পোর্টস:
গ্লাসগোর আকাশে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের পতাকা উড়ছে , এক কোণে রয়েছে লাল-সবুজের একটি গল্প। গল্পের নাম গ্লাসগোর বাংলাদেশ। হাজার মাইল দূরের দেশ। ভাষা আলাদা, আবহাওয়া আলাদা, জীবনযাত্রাও ভিন্ন। তবু গ্লাসগোর কিছু রাস্তায় হাঁটলে, কিছু দোকানে ঢুকলে, মানুষের মুখে কথা শুনলে মনে হবে বাংলাদেশ খুব দূরে নয়।
স্কটল্যান্ডের এই শহরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন অনেক বাংলাদেশি। কর্মসূত্রে, পড়াশোনা কেউবা নতুন জীবনের সন্ধানে। সময়ের সঙ্গে গ্লাসগোই হয়ে উঠেছে তাদের নতুন ঠিকানা। হৃদয়ের ভেতরে বাংলাদেশ রয়ে গেছে আগের মতোই।
একসময় পড়াশোনার জন্য গ্লাসগো এসেছিলেন সাগর। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ, নতুন চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে আজ তিনি পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। কয়েকটি রেস্তোরাঁর মালিক হয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন। প্রবাসের মাটিতে পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান গড়ে নিয়েছেন তিনি।
মিঠু, নাহিন, আশরাফদের গল্পও একই রকম। একসময় স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন গ্লাসগোতে। আজ এই শহরেই তাঁরা থিতু হয়েছেন। কেউ ব্যবসায়, কেউ চাকরিতে, কেউ নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। দেশের খবর, দেশের খেলা, দেশের সাফল্যের সঙ্গেই তাদের হৃদয়ের যোগাযোগ অটুট।
এই শহরে আছেন এমন অনেক মানুষ, যাদের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পও অনুপ্রেরণার। ডা. তারেক আবদুল্লাহ ছিলেন ঢাকা কলেজের ১৯৯২ ব্যাচের । গ্লাসগোতে তার রয়েছে নিজস্ব পরিচিতি ও সুনাম। শরীয়তপুরের মোস্তফা ভাইও দীর্ঘদিন ধরে এই শহরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। কর্মজীবনে সফল এই মানুষগুলো প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেট জয়, ফুটবলের সাফল্য, কোনো আন্তর্জাতিক আসরে লাল-সবুজের জন্য তাদের চোখে থাকে আলাদা উচ্ছ্বাস। কমনওয়েলথ গেমস গ্লাসগোয় আসায় সেই আবেগ আরও বেড়েছে। কেউ দিনের কাজ শেষে স্টেডিয়ামে যাবেন হাতে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে। কোনো স্কটিশ দর্শককে বোঝাবেন লাল-সবুজের গল্প। সন্তানের হাতে তুলে দেবেন বাংলাদেশের ছোট্ট পতাকা, যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে তাদের শিকড়ের কথা।
গ্লাসগোর বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোতেও চলে গেমসের আলোচনা। চায়ের কাপে উঠে এসেছে বিশ্বের ক্রীড়া তারকাদের গল্প। সেই আড্ডার কোনো এক মুহূর্তে ফিরে আসে বাংলাদেশ ক্রিকেট, ফুটবল আর দেশের ক্রীড়াঙ্গনের স্বপ্নের কথাও।
এই শহর অনেককে আপন করে নিয়েছে, তেমনি কাউকে কাউকে ফিরিয়েও দিয়েছে।
রানা ও শোভনের গল্পও তেমন। ২০১৪ সালে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস কভার করতে এসে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তখন দুজনই ছিলেন ছাত্র। চোখে ছিল নতুন স্বপ্ন, সামনে ছিল অজানা ভবিষ্যৎ। ভেবেছিলেন, এই শহরেই হয়তো গড়ে উঠবে তাদের নতুন ঠিকানা। কিন্তু প্রবাসের পথ সব সময় মসৃণ হয় না। এবার আবার গ্লাসগোয় এসে শুনলাম, কাগজপত্রের জটিলতায় রানা ফিরে গেছে বাংলাদেশে। আর শোভন পাড়ি জমিয়েছে ইতালিতে। যে শহরে একসময় তারা স্বপ্ন বুনেছিলেন, সেই গ্লাসগো শেষ পর্যন্ত তাদের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে ওঠেনি।
শোভন সে খুব ভালো গিটার বাজাত। তার গিটারের সুরে মিশে থাকত তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, দেশের স্মৃতি আর নতুন জীবনের স্বপ্ন।তারা দুজনই গ্লাসগোর বাইরে, এই শহরের বাংলাদেশি গল্পে রানা-শোভনদের মতো অনেক অসমাপ্ত অধ্যায়ও রয়ে গেছে।
কমনওয়েলথের মাঠে পদকের লড়াই হবে অ্যাথলেটদের। মাঠের বাইরে আরেকটি লড়াই চলবে নিজের সংস্কৃতি, পরিচয় আর ভালোবাসাকে ধরে রাখার। দূর দেশের শহরে থেকেও যারা হৃদয়ে বহন করেন পদ্মা, মেঘনা আর লাল-সবুজের স্বপ্ন।





