spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ দুর্বল ১০ ব্যাংকে

জেড নিউজ, ঢাকা :

দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। এর মধ্যে দুর্বল ১০ ব্যাংকেই রয়েছে খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ। এসব ঋণের বেশির ভাগই ‘মন্দ’ মানে শ্রেণিকৃত, যার আদায় অনিশ্চিত। কয়েকটি ব্যাংকের খুব খারাপ অবস্থার কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ হারের খেলাপি ঋণের দেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ হিসাবে গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিবেচনায় শীর্ষ ১০ ব্যাংকে রয়েছে চার লাখ ৩৯ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের  যা ৭২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পাঁচ শতাংশের নিচে রয়েছে।

এসব ব্যাংকে এত বেশি খেলাপি ঋণ কেন তা জানতে বেশ কয়েকজন ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল এমন বড় ব্যবসায়ীদের অনেকের ঋণ এখন ব্যাংকের খাতায় খেলাপি। আদায় না হওয়ায় দিন দিন এর পরিমাণ বাড়ছে।

ব্যাংকের খাতায় উল্লেখযোগ্য খেলাপি গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার এবং আরামিট গ্রুপ। এসব গ্রুপের নামে-বেনামে নেওয়া  ঋণের বড় অংশই পাচার হয়ে গেছে। ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদ রয়েছে খুব সামান্য। এর বাইরে অনেক আগে খেলাপি হওয়া সাদ মুসা, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ, হলমার্কসহ অনেক পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। বড় খেলাপি ঋণের সঙ্গে সম্পৃক্তদের অনেকেই পলাতক বা জেলে আছেন। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সচল নেই। ঋণ পুনঃতপশিলে নানা সুবিধা দেওয়া হলেও তারা ঋণ পরিশোধ করতে আসছেন না। সার্বিকভাবে ঋণ আদায় পরিস্থিতি ভালো নয় বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

ব্যাংকাররা জানান, ঋণ পুনঃতপশিলের মাধ্যমে আদায় বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবে একের পর এক ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১০ বছর মেয়াদে বিশেষ পুনঃতপশিল করা ঋণেও নতুন করে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আয় খাতে নেওয়া সুদ মওকুফ করেও খেলাপি ঋণ আদায় করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা সচল করতে বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।

এত সব সুবিধার পরও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বেড়েছে। বেড়ে ফের ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোট ঋণের যা ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থঋণ আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, বন্ধকি সম্পদ বিক্রির ক্ষমতা কমানো এবং খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়ার জন্য কোম্পানি গঠন খুব জরুরি। সে দিকে জোর না দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু শিথিলতার দিকেই হাঁটছে।

খেলাপি ঋণের শীর্ষে কারা

অনিয়ম-জালিয়াতিতে আলোচিত ব্যাংকগুলোই খেলাপি ঋণের শীর্ষে রয়েছে। গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা ১০ ব্যাংকের ঋণস্থিতি ছয় লাখ ৭০ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। এ ঋণের মধ্যে চার লাখ ৩৯ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

পরিমাণ বিবেচনায় গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের শীর্ষে উঠে এসেছে এক সময়ের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির এক লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা এখন খেলাপি। যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি তৈরি হয়েছে ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকটিতে কেবল এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে নাসা, বসুন্ধরাসহ বিভিন্ন গ্রুপ খেলাপির তালিকায় রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে তারা সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন। বিভিন্ন ছাড় দিয়ে হলেও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। আগামী প্রান্তিকে এর প্রভাব দেখা যাবে। তিনি বলেন, এস আলম গ্রুপের খেলাপি বাদ দিলে এখন তাদের খেলাপি ঋণ ২৩ শতাংশের নিচে। ব্যাংক খাতের গড় খেলাপির তুলনায় যা কম।

খেলাপি ঋণে এখন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা ব্যাংক। জনতার এক লাখ ৯০৪ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা ব্যাংকটির ঋণের যা ৭৫ শতাংশের বেশি। এই খেলাপি ঋণের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের রয়েছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এস আলম গ্রুপের প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। অ্যাননটেক্স গ্রুপের রয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো। এর বাইরে শীর্ষ খেলাপি ঋণের তালিকায় রয়েছে ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন আলোচিত খেলাপি।

জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান বলেন, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের ৫৬ শতাংশই রয়েছে শীর্ষ পাঁচ গ্রুপের কাছে। এসব ঋণখেলাপি হয় জেলে আছেন কিংবা দেশের বাইরে পলাতক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নন-ফান্ডেড থেকে এসব ঋণ ফান্ডেড ঋণে পরিণত হয়। যে কারণে বন্ধকি সম্পত্তি তেমন নেই। শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে কেবল অ্যাননটেক্স গ্রুপের সম্পদ রয়েছে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে তারা সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে। ঋণ আদায়ের জন্য তারা মেলার আয়োজন, টাস্কফোর্স গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন।

পরিমাণের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে একীভূত হওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা বা ৯৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশই এখন খেলাপি। ঋণের বড় অংশই বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে একসময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণকারী গ্রুপ এস আলম গ্রুপ নিয়ে গেছে। ফার্স্ট সিকিউরিটিসহ পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হচ্ছে।

একীভূত হওয়া আরেক ব্যাংক এক্সিম রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। ব্যাংকটির ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা বা প্রায় ৭১ শতাংশ খেলাপি। আওয়ামী লীগের সময়ে এই ব্যাংক পরিচালিত হতো ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান ও নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের মাধ্যমে। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপির তালিকায় এস আলম, সিকদারসহ বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে।

খেলাপি ঋণে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। ব্যাংকটির ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা বা ৪৪ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপির তালিকায় রয়েছে জজ ভূঞা গ্রুপ, তানাকা গ্রুপ সাত্তার গ্রুপ, মুন গ্রুপ, প্যাসিফিক গ্রুপ, সাদ মুসা, নাভানা ফার্নিচারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে শীর্ষ তালিকায়।

আওয়ামী লীগের সময়ে এস আলমের কর্তৃত্বে থাকা আরেক ব্যাংক এসআইবিএলের মোট ঋণের ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা বা ৭৮ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে এখন ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। সালমান এফ রহমানের কর্তৃত্বে ছিল আইএফআইসি ব্যাংক। ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা বা ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। সিকদার গ্রুপের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৬ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। এস আলমের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া অপর ব্যাংক ইউনিয়নের ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা বা ৯৭ শতাংশ ঋণ খেলাপি। খেলাপি ঋণে দশম অবস্থানে থাকা এবি ব্যাংকের ২০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বা ৫৬ শতাংশের বেশি খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ঋণখেলাপির একটি অংশ পলাতক বা জেলে আছেন। তাদের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম। এর বাইরে একটি পক্ষ আছে, যারা নানা সুবিধা নিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে চায় না। এখন যেহেতু বারবার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে সেহেতু আরও সুবিধা দেওয়া হবে কিংবা ঋণ শোধ না করলেও কিছু হবে না– এমন আশায় আছেন একটি পক্ষ। ঋণখেলাপিদের বারবার ঢালাও সুবিধা না দিয়ে কঠোরতার দিকে যেতে হবে। তা ছাড়া খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়