জেড নিউজ,ঢাকা:
পৃথিবী আজ নানা সংকটে জর্জরিত। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে দূষণ-সবকিছুর পেছনেই মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড দায়ী। তবে ধরিত্রীকে বিষিয়ে তোলার পেছনে যে পণ্যটি নীরবে সাংঘাতিক ভূমিকা রাখছে তা হল তামাক। তামাক কেবল মানুষের স্বাস্থ্যকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে না, বরং এটি মাটি, পানি এবং বায়ুর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের নবম বৃহত্তম তামাক ব্যবহারকারী দেশ। দেশের ১৫ বছর ও তদুর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশ মানুষ ধূমপানে অভ্যস্ত। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রতিফলন। বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ অকালে মারা যান (টোব্যাকো এটলাস, ২০২৪)।
তামাক উৎপাদন একটি দীর্ঘ ও ক্ষতিকর প্রক্রিয়া। চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন এবং ব্যবহার— সব ধাপেই পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তামাক চাষের জন্য ব্যাপক হারে বন উজাড় হয়। এক একর জমিতে যে পরিমাণ তামাক উৎপন্ন হয় তা শুকানোর জন্য ৫ টন কাঠের প্রয়োজন। ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ে। একইসঙ্গে তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটি ও পানিকে দূষিত করে, যা কৃষি ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
ধূমপানের ফলে ধোঁয়া বাতাসে মিশে যায়, ফলে বায়ু দূষণ ঘটে। এতে অধূমপায়ীরাও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। সোসাইটি ফর রিসার্চ অন নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকোর তথ্য অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ঢাকার প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ৯২ শতাংশ শিশুর শরীরে উচ্চমাত্রার নিকোটিন পাওয়া গেছে।
তামাকজাত পণ্যের বর্জ্যও পরিবেশের জন্য একটি বড় হুমকি। সিগারেটের অবশিষ্টাংশে থাকা প্লাস্টিক ফিল্টার বা বাট এবং প্যাকেট মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণ করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিড়ি সিগারেটের বিষাক্ত বর্জ্য হিসেবে ৪০ হাজার ৪৯০ টন বাট ও প্যাকেট মাটিতে মিশে মাটি ও পরিবেশ দূষণ করছে। আর সেগুলো নদী-নালা ও সমুদ্রে গিয়ে জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে (টোব্যাকো এটলাস)। ফলে তামাক একটি ‘ডাবল থ্রেট’। এটি প্রাণী ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই অর্থবছরে তামাক খাত থেকে সরকারের মোট রাজস্ব আয় ছিল মাত্র ৪১ হাজার কোটি টাকা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২৫)। মূলত তামাক থেকে যে রাজস্ব আসে, তার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হ্রাস, অকালমৃত্যুজনিত আর্থিক ক্ষতি এবং পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায়।
একটি সুস্থ পৃথিবীর পূর্বশর্ত হল সুস্থ মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর তামাকের যে কালো থাবা, তা দেশের পরিবেশ প্রতিনিয়ত বিষিয়ে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ ও তরুণ প্রজন্মকে তামাকের ছোবল থেকে বাঁচাতে এবং একটি সুস্থ সবল জাতি গঠনে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই কর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। তামাকের ধোঁয়ামুক্ত নির্মল বাতাস আর সুস্থ নাগরিকই পারে একটি সবুজ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে।



