জেড নিউজ ডেস্ক:
বিদায় ঈদুল আজহা। বিদায় কোরবানি। কোরবানি প্রতি বছর আমাদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়। আজ আমরা মৌলিক পাঁচটি শিক্ষা নিয়ে কথা বলব ইনশাআল্লাহ।
এক. আল্লাহর হুকুমের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। যেমন আত্মসমর্পণ করেছিলেন ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)। ইবরাহিম খলিল (আ.)-এর পুরো জীবনটাই ছিল আল্লাহর প্রেমে নিবেদিত। আল্লাহর হুকুমের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের স্নিগ্ধ সৌরভ ছড়ানো তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে। কোরবানিও সেই নিবেদনের একটি ঝলক। আল্লাহর প্রেমে মাতোয়ারা ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর চেতনাদীপ্ত সে গল্পটি কোরআন মাজিদে বিধৃত হয়েছে সুনিপুণভাবে। ‘অতঃপর সে পুত্র যখন ইবরাহিমের সঙ্গে চলাফেরা করার উপযুক্ত হলো, তখন সে বলল, বাছা! আমি স্বপ্নে দেখছি যে তোমাকে জবাহ করছি। এবার চিন্তা করে বল, তোমার অভিমত কী। পুত্র বলল, আব্বাজি! আপনাকে যা নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে আপনি সেটাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে সবরকারীদের একজন পাবেন।
সুতরাং (সেটা ছিল এক বিস্ময়কর দৃশ্য) যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং পিতা পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিল। আর আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। নিশ্চয়ই আমি সৎকর্মশীলদের এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কোরবানির বিনিময়ে সে শিশুকে মুক্ত করলাম। (সুরা সাফফাত-১০২- ১০৭) দুই. হৃদয়ের গভীরে তাকওয়ার চেতনা লালন আল্লাহতায়ালা বলেন, আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না। আল্লাহর কাছে পৌঁছে তোমাদের (কোরবানিদাতাদের) তাকওয়া। (সুরা হজ-৩৭) এই তাকওয়া জিনিসটা কী? কাকে বলে তাকওয়া?
তাকওয়া মানে কী?
তাকওয়া শব্দের শাব্দিক অর্থ বেঁচে থাকা। আল্লামা আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ আল কোরতুবি (রহ.) (মৃত্যু-৬৭১ হিজরি) তার তাফসিরে তাকওয়ার ব্যাখ্যায় বলেন- ‘একবার আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে তাকওয়ার পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। উবাই (রা.) তখন পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, আমিরুল মুমিনিন! আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড় দিয়ে পথ চলেছেন? উমর (রা.) বলেন- হ্যাঁ। উবাই (রা.) বলেন, তখন কীভাবে পথ চলেছেন? কাপড় টেনে খুব সতর্কতার সঙ্গে চলেছি, যেন গায়ে কাঁটা না লাগে, উমর (রা.)-এর জবাব। উবাই (রা.) বলেন, এটাই তাকওয়া। অর্থাৎ খুব সতর্কতার সঙ্গে দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করা, যাতে কখনো আল্লাহর নাফরমানি না হয়ে যায়। আমার স্রষ্টা যেন সব সময় আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন।’ (আল জামে লি আহকামিল কোরআন, ১/১৪৭)
তিন. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের স্পৃহা
কোরবানি আমাদের শিক্ষা দেয় জীবনজুড়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মনন মানসে জাগরূক রাখার। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ কেবলই আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক। (সুরা আনআম-১৬২)
চার. অসহায় গরিব মিসকিনদের প্রতি লক্ষ্য রাখা আল্লাহতায়ালা বলেন, সুতরাং (হে মুসলিমগণ!) সেই পশুগুলো (কোরবানির পশু) থেকে তোমরা নিজেরাও খাও এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও। (আল হজ- ২৮) সুতরাং বছরজুড়ে অসহায় গরিব মিসকিনদের পাশে দাঁড়ানোর বিমল পাঠ দেয় কোরবানি। পাঁচ. জীবনজুড়ে চাই ধৈর্যের অনুসরণ পিতা ইবরাহিম (আ.) যখন আল্লাহর আদেশে পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হলেন তখন পুত্র বলেছিলেন, আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। (সুরা সাফফাত-১০২) ধৈর্যশীল কারা? সবর বা ধৈর্য কাকে বলে? সবর হচ্ছে- ‘দুঃখ বেদনা সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালার প্রতি কোনো অভিযোগ না তোলা; বরং আল্লাহতায়ালার ফায়সালার প্রতি বুদ্ধিগতভাবে সন্তুষ্ট থাকা।’ খ্যাতিমান মুফাসসির, লেখক ও ঐতিহাসিক হাফেজ আবুল ফিদা ইমাদুদ্দীন ইসমাইল ইবনে উমর (জন্ম- ৭০০হি. মৃত্যু- ৭৭৪হি.) যিনি হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) নামে পরিচিত, তাঁর বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘তাফসিরুল কোরআনিল আজিমে’ সবরের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আমিরুল মুমিনিন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘সবর দুই ধরনের। একটি হচ্ছে বিপদের সময় সবর করা। আরেকটি হচ্ছে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার কষ্ট সহ্য করা। (তাফসিরুল কোরআনিল আজিম : ১/১১২ দারুল হাদিস, কায়রো, মিসর থেকে প্রকাশিত সংস্করণ)



