spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

আর্জেন্টিনাকে ধসিয়ে বিশ্বকাপ জিতল তারুণ্যনির্ভর স্পেন

জেড নিউজ স্পোর্টস:
লাইফ স্টেডিয়ামে যখন শেষ বাঁশিটা বাজল, লিওনেল মেসির বিষণ্ন মুখের ওপর তখন ডুবে যাওয়া সূর্যের আলো– চার বছর আগের লুসাইলের সেই রূপকথার এক নির্মম, নিষ্ঠুর বৈপরীত্য! ‘দিবু’ মার্টিনেজের ১৩টি অতিমানবীয় সেভের সেই অবিশ্বাস্য দেয়াল, এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ডের পর ১০ জনের আর্জেন্টিনার সেই আদিম ডিফেন্স– সবকিছু স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে ফুটবলের স্বর্গীয় সিংহাসন ছিনিয়ে নিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন।

লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসদের গতিময় উইং-প্লে আর মাঝমাঠের নিখুঁত তিকিতাকার অলকানন্দায় ভেসে গেল স্কালোনির রক্ষণাত্মক সাম্রাজ্য। ১-০ গোলে স্পেনের রক্তকরবীর কাছে মাথা নত করতে হলো আর্জেন্টিনাকে। ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে মেসি-যুগের এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্ব ফুটবল দেখল এক নতুন সূর্যোদয়, যেখানে মেসির রাজমুকুট কেড়ে নিয়ে নিউ জার্সির বুকে রাজ্যাভিষেক হলো একুশ শতকের নতুন ফুটবল সম্রাট– স্পেনের! ২০১০ সালের পর ফের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন।

যারা বিশ্বাস করেছিলেন, ফুটবল-ঈশ্বর মেসিকে শূন্য হাতে ফেরাবেন না, তারা এদিন এক মহাসত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্তব্ধ। স্প্যানিশ ফুটবলের সেই উদ্ধত, তারুণ্যের দীপ্তিতে উজ্জ্বল নিখুঁত জ্যামিতির কাছে পরাস্ত হলো লাতিন আমেরিকার চিরন্তন ঘরানা। স্পেনের তিকিতাকার সেই মরণকামড়ে নীল-সাদার স্বপ্ন আজ যেন ডানাভাঙা পাখির মতো আছড়ে পড়ল মাঠের সবুজ ঘাসে। ৩৯ বছরের এক ক্লান্ত জাদুকর, যাঁর কাঁধে চেপে বিগত কয়েক বছর এক অবিনাশী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল আর্জেন্টিনা, আজ তাঁর শরীরেও যেন ভর করেছিল এক অসহনীয় ক্লান্তি এবং অবসাদগ্রস্ততা। মাঝমাঠে রদ্রি-ইয়ামালদের সেই ত্রাসজাগানিয়া ক্ষিপ্রতা আর স্পেস-ফুটবলের আগ্রাসনের সামনে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল।

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ম্যাচ রিপোর্ট লিখতে বসে পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে যে কোনো ফুটবল রোমান্টিকের বুক কেঁপে উঠবে– পুরো ৯০ মিনিটে অবিশ্বাস্য ৬৬.৩ শতাংশ বল পজেশন ধরে রেখেছিল স্প্যানিশ আর্মাডা, যেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা স্রেফ ৩৩.৭ শতাংশ বলের মালিকানা নিয়ে কোণঠাসা হয়ে ধুঁকেছে। গোলমুখের নির্মম সত্যটা আরও ভয়াবহ– যেখানে স্পেনের আক্রমণাত্মক ঝড়ের ১৭টা কামানের গোলা আছড়ে পড়েছে, সেখানে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার পাশে জ্বলজ্বল করছে এক বড় শূন্য! ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে এই নীল-সাদা ব্রিগেডকে চেনাই যায়নি। ভাগ্যদেবীর অশেষ কৃপায় বারবার নিশ্চিত গোল হজম করা থেকে বেঁচেছে তারা। কিন্তু ৯০ মিনিটে নাটকের আসল ক্লাইম্যাক্স তখনও বাকি ছিল। স্পেনের ২৩ বার প্রতিপক্ষের বক্সে সশব্দে ঢুকে পড়ার বিপরীতে স্কালোনির দল মাত্র দুবার পা ছোঁয়াতে পেরেছিল লা রোজাদের দুর্গে। স্প্যানিশদের ৬৪৭টি নিখুঁত পাসের আলপনার সামনে মেসিদের ৩৩৭টি পাস আর ৭৯.৫ শতাংশ পাসিং অ্যাকুরেসি স্রেফ খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে। তার ওপর ম্যাচের অন্তিমলগ্নে যখন এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন, তখন আর্জেন্টিনাকে বাধ্য হয়েই অলআউট ডিফেন্সের এক নরক যন্ত্রণার গহ্বরে সেঁধিয়ে যেতে হলো।

সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের সমস্ত ট্যাকটিকসকে একা বুক দিয়ে রুখে দিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ; একের পর এক ১৩টি অতিমানবীয় গোল সেভ করে তিনি যেন একাই আস্ত একটা প্রাচীর! ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নিকো উইলিয়ামসের সেই হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়া বুলেট কিক কিংবা তার আগে লামিনে ইয়ামালের বিষাক্ত ফ্রিকিক– সবকিছুই এসে আছড়ে পড়ল দিবুর ওই ইস্পাতকঠিন গ্লাভসে। ১৯টি ফাউল করে ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করা আর্জেন্টিনাকে প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধেও যে কোনো আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে দেননি রদ্রি-পেদ্রিরা, তার একমাত্র কারণ মাঝমাঠের ওই সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

একটা চেষ্টা ছিল আর্জেন্টাইনদের– যদি কোনো অলৌকিক উপায়ে টাইব্রেকার বা অতিরিক্ত সময়ে ভাগ্য বদলে দেওয়া যায়। কিন্তু প্রতিবারই কি ভাগ্য সহায় হয়! তা ছাড়া ভাগ্য তো থাকে সাহসীদের সঙ্গে। এত ভিতু আর্জেন্টিনাকে এর আগে কবে দেখা গেছে? প্রেসবক্সে গজগজ করতে থাকা পাশের আর্জেন্টাইন সাংবাদিক বলে দিলেন– মেসি-উত্তর এই দল আরও বিপদে পড়বে সামনে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়