জেড নিউজ ডেস্ক:
ফ্রান্সজুড়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং সরকারি সেবার মানের অবনতির প্রতিবাদে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো রাস্তায় নেমেছে লাখ লাখ মানুষ। রাজধানীতে বড় ধরনের গণধর্মঘটের প্রাক্কালে আয়োজিত এই বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফরাসি রাজধানী প্যারিসের রাজপথ। পরিস্থিতি সামলাতে টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ। ফ্রান্সের সংঘাতের ঢেউ কেবল প্যারিসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি-জার্মানি, ইতালি ও আলবেনিয়াসহ পুরো ইউরোপজুড়ে তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়েছে একই ধরনের তীব্র আন্দোলন।
প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। সুনির্দিষ্ট পথ ধরে শান্তিপূর্ণ যাত্রা শেষ হলেও সন্ধ্যার দিকে একদল বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল, পেট্রোল বোমা (মোলোটোভ ককটেল) এবং আতশবাজি নিক্ষেপ শুরু করে।
এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্যারিসে এক জান্দার্মে (ফরাসি পুলিশ)-এর দিকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হলে তাঁর পায়ে মারাত্মক অগ্নিদগ্ধ আঘাত লাগে। মোট ৫ জন পুলিশ সদস্য এদিনের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন। বিক্ষোভ সামলাতে ফরাসি পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। রাস্তায় একের পর এক ময়লার বিন ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্যানুসারে, শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। এর মধ্যে কেবল প্যারিসেই সমাগম ঘটে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের। অবশ্য বিক্ষোভ আয়োজক তরুণ সংগঠনগুলোর দাবি- দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ এবং প্যারিসেই তা ২ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। রাত ৮টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশজুড়ে দাঙ্গা ও অরাজকতার অভিযোগে ৫00-এর বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হেলোউইন ঘিরে বিশেষ সতর্কতা ও গ্রেপ্তার অভিযান
দুই সপ্তাহ আগের ভয়াবহ সহিংসতা, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি এড়াতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিশেষ করে শনিবার হ্যালোউইনের উৎসব থাকায় বিক্ষোভকারীরা যাতে মুখের মাস্ক বা ভীতিপ্রদ পোশাকের আড়ালে নিজেদের পরিচয় গোপন করতে না পারে, সেজন্য কঠোর বার্তা দিয়েছিল প্যারিস পুলিশ প্রশাসন।
আইন অনুযায়ী জনসমক্ষে মুখ ঢাকা ও ভুয়া অস্ত্র বহনে জরিমানার বিধান বলবৎ রেখে শহরজুড়ে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, পুলিশ সারাদেশে প্রায় ৪০,০০০ তল্লাশি চালিয়েছে, যার মধ্যে শুধু প্যারিস অঞ্চল (ইল-দ্য-ফ্রান্স)-এই ছিল ১৫,০০০। তা সত্ত্বেও মার্সেই শহরে ফুটলকার জুতার দোকানে চুরি ও লুটপাটের সময় হাতেনাতে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। লিও এবং তুলুসেও টিয়ার গ্যাস ছুড়তে বাধ্য হয় পুলিশ।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আগামী সপ্তাহের মহাধর্মঘটের ডাক
আন্দোলন আরও জোরালো করার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রমিক ও শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলো। মঙ্গলবার ফ্রান্সের দুটি বড় ছাত্র সংগঠন উচ্চবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণাঙ্গ ব্লকেড বা অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার মজুরি বৃদ্ধি, পেনশন রক্ষা এবং সরকারি বাজেট ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে অল-আউট জাতীয় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বেশ কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন।
এদিকে এই আন্দোলনকে ঘিরে তীব্র হচ্ছে রাজনীতি। ফরাসি কট্টর-বামপন্থী দল ‘ফ্রান্স আনবাউড’-এর নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁ ও তাঁর দলের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্যারিসের মিছিলে যোগ দেন। সমালোচকদের অভিযোগ, মেলঁশঁ আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণদের অসন্তোষকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, কট্টর-ডানপন্থী নেশনাল র্যালি দলের সভাপতি জর্ডান বারদেলা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপকারীদের তীব্র নিন্দা জানিয়ে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
জার্মানিতে লুটপাট ও আগুন, আলবেনিয়ায় ককটেল বৃষ্টি
ফ্রান্সের এই অসন্তোষের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতেও। তরুণ প্রজন্মই এখন পুরো মহাদেশের রাজপথ কাঁপিয়ে তুলছে।
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন, হামবুর্গ, ব্রেমেন এবং কোলনে তীব্র সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভকারীরা একটি অস্ত্রের দোকান ভেঙে ভেতরে ঢুকে অস্ত্র ও জুতা-কাপড় লুট করে। পরে পুলিশ দুই রাউন্ড অস্ত্র উদ্ধার করে। বার্লিনের রোজেনথালের প্লাৎজে ময়লার বিন ও ই-স্কুটারে আগুন লাগানো হয়, যেখানে অন্তত ২৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। কোলনে প্রায় ৫০ জনকে এবং বার্লিনে ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংবাদপড়ুন
এদিকে, আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শিক্ষ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রধানমন্ত্রী এডি রামায় পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের আন্দোলন চরম সহিংস রূপ নিয়েছে। পুলিশের ওপর পাথর ও মোলোটোভ ককটেল ছোঁড়া হয়।
ইতালির রোম, মিলান ও তুরিনেও শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বড় মিছিলের খবর পাওয়া গেছে।
ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্য ও জ্বালানির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের কারণে ছড়িয়ে পড়া এই ক্ষোভ শিগগিরই প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আগামী সপ্তাহে ধর্মঘট শুরু হলে ইউরোপের অর্থনীতি ও জনজীবন আরও বড় ধাক্কার মুখোমুখি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।





