spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

শুধু কি মানুষই হাসে?

জেড নিউজ ডেস্ক :  

ভাবুন তো, কেউ আপনাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আপনি হেসে কুটি কুটি হয়ে যাচ্ছেন। এবার একই কাজ নিজেই নিজের সঙ্গে করার চেষ্টা করুন। হচ্ছে না, তাই তো? এই ছোট্ট ঘটনাটিই আমাদের নিয়ে যায় মানুষের অন্যতম রহস্যময় আচরণের সামনে— হাসি ।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দার্শনিকরা এ নিয়ে ভেবেছেন। আধুনিক যুগে স্নায়ুবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, বিবর্তনবিদ হাসির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজও বিজ্ঞান একটি সহজ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেনি— মানুষ হাসে কেন?

হাসি ও রসবোধ ব্যাখ্যা করার জন্য এ পর্যন্ত শতাধিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এমন কোনো তত্ত্ব নেই, যা প্রতিটি হাসি, প্রতিটি কৌতুক কিংবা প্রতিটি অপ্রতিরোধ্য অট্টহাসিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে। মজার বিষয় হলো, শিশুরা কথা বলতে শেখারও অনেক আগে হাসতে শেখে। সাধারণত তিন থেকে চার মাস বয়সেই একটি শিশু প্রথমবার প্রাণ খুলে হাসে। এ পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়— হাসি সম্ভবত ভাষারও বহু আগে এসেছে।

হাসি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানী রবার্ট প্রোভাইন। হাজার হাজার মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথন পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। তার গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ একা থাকার তুলনায় অন্য মানুষের সঙ্গে থাকলে প্রায় ত্রিশ গুণ বেশি হাসে। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ হাসির পেছনেই কোনো কৌতুক থাকে না। ‘আচ্ছা, পরে দেখা হবে। কী খবর তোমার?’ এ ধরনের একেবারে সাধারণ বাক্য বলার পরও মানুষ হেসে ওঠে।

অনেক বিজ্ঞানীর মতে, বিবর্তনের ইতিহাসেও হাসির জন্ম হয়েছে ঠিক এই কারণেই। ধরুন, আদিম যুগে একদল মানুষ জঙ্গলের মধ্যে হাঁটছে। হঠাৎ পাশের ঝোপ নড়ে উঠল। সবাই আতঙ্কিত। মনে হলো কোনো হিংস্র প্রাণী আক্রমণ করতে এসেছে। কিন্তু মুহূর্ত পর দেখা গেল, ওটা আসলে দলেরই এক সদস্যের দুষ্টুমি। সেই মুহূর্তে সবার মুখে যে হাসি ফুটে ওঠে, সেটিই যেন বাকিদের জানিয়ে দেয়, ‘ভয়ের কিছু নেই। আমরা নিরাপদ।’

আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য হলো, হাসি কেবল মানুষের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়। শিম্পাঞ্জি, গরিলা ও ওরাংওটানের মতো প্রাইমেটদের খেলাধুলার সময় হাসির মতো শব্দ করতে দেখা যায়। ডলফিনেরও রয়েছে আনন্দসূচক সামাজিক শব্দ। তবে সবচেয়ে মজার আবিষ্কারটি এসেছে ইঁদুর নিয়ে গবেষণা থেকে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ইঁদুরকে আলতো করে সুড়সুড়ি দিলে তারা অতিসূক্ষ্ম আল্ট্রাসোনিক শব্দ করে, যাকে গবেষকরা হাসির সমতুল্য বলে মনে করেন। আরো আশ্চর্যের বিষয়, তারা পরে আবার সেই গবেষকের কাছেই ফিরে আসে, যিনি তাদের সুড়সুড়ি দিয়েছিলেন।

হাসি শুধু মনকেই নয়, শরীরকেও প্রভাবিত করে। প্রাণ খুলে হাসলে শরীরে অক্সিজেন গ্রহণ বাড়ে, হৃদস্পন্দন সাময়িকভাবে বেড়ে যায়, মুখ ও পেটের অসংখ্য পেশি একসঙ্গে সক্রিয় হয় এবং মানসিক চাপের জন্য দায়ী কিছু হরমোনের মাত্রা কমে আসে। তাই কেউ কেউ মজা করে একে ‘শরীরের ভেতরের জগিং’ বলেও অভিহিত করেন।

তবে হাসি সব সময় আনন্দের প্রকাশ নয়। হাসপাতাল, শ্মশান, পরীক্ষার হল কিংবা ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও মানুষকে কখনো কখনো হেসে ফেলতে দেখা যায়। এটিকে বলা হয় নার্ভাস লাফটার। একই কারণে চিকিৎসক, দমকলকর্মী, সেনাসদস্য কিংবা জরুরি সেবাকর্মীদের মধ্যে অনেক সময় ডার্ক হিউমারের প্রচলন দেখা যায়। এটি নিষ্ঠুরতা নয়, বরং প্রতিনিয়ত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া মানুষদের মানসিকভাবে টিকে থাকার একটি উপায়।

হাসির আরেকটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সংক্রামক। কেউ হাসতে শুরু করলে আশপাশের মানুষও অজান্তেই হাসতে শুরু করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যে দম্পতিরা একসঙ্গে বেশি হাসেন, তাঁদের সম্পর্ক সাধারণত বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিষয়টি কেবল রসবোধের নয়,বরং একসঙ্গে হাসতে পারার ক্ষমতার।

আজও বিজ্ঞান হাসির প্রতিটি রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট-হাসি ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা ভূগোলের সীমারেখা মানে না। পৃথিবীর কোথাও মানুষ লেখে ‘হা হা’, কোথাও ‘জাজাজা’, আবার থাইল্যান্ডে অনলাইনে হাসি প্রকাশ করা হয় ‘৫৫৫’ লিখে, কারণ থাই ভাষায় পাঁচ সংখ্যাটির উচ্চারণ ‘হা’। শব্দ আলাদা হতে পারে, কিন্তু পুরো পৃথিবী জুড়েই হাসির অনুভূতি এক। তাই বেশি বেশি হাসুন, সুস্থ থাকুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়