spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

বিয়ে গোপন রাখা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?

জেড নিউজ , ঢাকা :

 বিয়ে একজন নারী ও একজন পুরুষের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত অঙ্গীকার, একটি ইবাদত এবং সুস্থ ও শালীন সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। ইসলাম বিয়েকে সহজ, সম্মানজনক ও প্রকাশ্য করার শিক্ষা দিয়েছে।

যাতে সমাজে বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং সন্দেহ, অপবাদ ও অনৈতিকতার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আজকাল নানা কারণে অনেকেই বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে, কেউ পারিবারিক বা সামাজিক চাপে, আবার কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ, দ্বিতীয় বিয়ে বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে বিবাহকে আড়াল করেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বিয়ের বিষয় গোপন রাখা কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে?

ইসলাম বিয়েকে এমন একটি সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা হবে সমাজের কাছে স্বীকৃত, মর্যাদাপূর্ণ এবং সন্দেহমুক্ত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দিয়ে দাও এবং তোমাদের সৎকর্মপরায়ণ দাস-দাসীদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)

 তাই ইসলামে বিয়ে এমনভাবে সম্পন্ন হওয়া উচিত, যাতে তা বৈধ ও স্বীকৃত সম্পর্ক হিসেবে সবার কাছে পরিচিত হয়।

এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ে প্রকাশ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই বিয়ে প্রকাশ করো, মসজিদে সম্পন্ন করো এবং এর উপলক্ষে দফ বাজাও।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৯)

হাদিসের শিক্ষা হলো, মুসলিম সমাজে বিয়ে যেন গোপন না থাকে; বরং এমনভাবে প্রকাশিত হয়, যাতে সবাই জানতে পারে এটি একটি বৈধ ও শরিয়তসম্মত সম্পর্ক। কারণ গোপনীয়তা অনেক সময় সন্দেহ, অপবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার।

ইসলামী শরিয়তে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে—যেমন উভয় পক্ষের সম্মতি, কনের ওয়ালি (জুমহুর আলেমদের মতে), দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী এবং মোহর নির্ধারণ। এসব শর্ত পূরণ হলে বিয়ে বৈধ হয়। কিন্তু বৈধ হওয়া আর বিয়ে গোপন রাখা—এ দুটি বিষয় এক নয়।

যদি সাক্ষীদের উপস্থিতিতে শরিয়তের সব শর্ত পূরণ করে বিয়ে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেটি বৈধ হতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘদিন বিয়ের বিষয়টি সমাজ, আত্মীয়স্বজন কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে গোপন রাখা ইসলামের আদর্শ নয়। বিশেষ করে যদি এর মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়, কারও অধিকার নষ্ট হয় বা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে গুনাহের কাজ।

বর্তমান সময়ে অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ে সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। ইসলাম একাধিক বিয়ার অনুমতি দিয়েছে, তবে তার সঙ্গে ন্যায়বিচারের কঠোর শর্তও আরোপ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩)

অতএব, দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ হলেও মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করা কিংবা অন্যায়ভাবে বিষয়টি গোপন রাখা ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থী। কারণ ইসলাম শুধুমাত্র বাহ্যিক বৈধতার শিক্ষা দেয় না; বরং সততা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতার ওপরও সমান গুরুত্ব দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)

তবে বিশেষ কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে—যেমন নিরাপত্তাজনিত কারণ, পারিবারিক জটিলতা বা সাময়িক কোনো বৈধ প্রয়োজনের কারণে—স্বল্প সময়ের জন্য বিয়ের বিষয়টি সীমিত পরিসরে রাখার অবকাশ থাকতে পারে। কিন্তু সেটি কখনোই স্থায়ী গোপনীয়তা বা প্রতারণার হাতিয়ার হতে পারে না। ইসলামের উদ্দেশ্য হলো, যথাসময়ে বিয়ে প্রকাশিত হবে এবং উভয় পক্ষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

ইসলাম এমন একটি সমাজ গড়তে চায়, যেখানে বৈধ সম্পর্ক সম্মান পায় এবং অবৈধ সম্পর্কের সব পথ রুদ্ধ হয়। তাই বিয়ে কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। শরিয়তের শর্ত পূরণ হলে বিয়ে বৈধ হলেও, অকারণে বা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বিয়ে গোপন রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ে ঘোষণা ও প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সংরক্ষিত থাকে, সন্তানদের বংশপরিচয় সুস্পষ্ট হয়, সমাজে সন্দেহ ও অপবাদ দূর হয় এবং পারিবারিক জীবনে আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় থাকে।

অতএব, একজন সচেতন মুসলিমের উচিত বিয়েকে লুকিয়ে না রেখে যথাসম্ভব প্রকাশ করা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করা এবং এমন কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা, যা প্রতারণা, ফিতনা বা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার কারণ হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়