জেড ন্বিউজ, ঢাকা:
বাবার দাফন শেষ করে রাতে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন, আর ভোর পেরোতেই এইচএসসি পরীক্ষার হলে হাজির—জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে পরীক্ষা দেওয়া বাগেরহাটের শিক্ষার্থী ইকন দাড়িয়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি চলমান এইচএসসি পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে চাকরি করতে না হয়, সে জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ইকনের বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া (৪৫) মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে এসে পড়ে। বাবার দাফন শেষে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতে তাকে কর্মস্থলে ফিরতে হয়। সারারাত নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন করে বুধবার সকালে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। এমন পরিস্থিতিতেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা প্রশংসিত হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
বুধবার (২৩ জুলাই) রাতে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) ফারহান ইশতিয়াক ফোন করে ইকনকে শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী তার পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ইকন দাড়িয়া সদ্য প্রয়াত ইসরাফিল দাড়িয়ার ছোট ছেলে। তিনি বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পরিবারের আর্থিক সংকট সামাল দিতে পড়াশোনার পাশাপাশি শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের পালায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন।
শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী ফারহান ইশতিয়াক জানান, চলমান এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ইকনকে যাতে আর চাকরি করতে না হয়, সে জন্য আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। একই সঙ্গে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তার উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ইকনের সংগ্রামী জীবনের গল্প মঙ্গলবার রাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার কঠিন জীবনসংগ্রাম ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরপরই শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরিবারের স্বজনদের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ইকনের বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া। পরে সকালেই তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বাদ জোহর জানাজা শেষে তার মরদেহ গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
ইসরাফিল দাড়িয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার বড় ছেলে ইমনও একসময় বাবার সঙ্গে কাজ করতেন। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব অনেকটাই ছোট ছেলে ইকনের ওপর এসে পড়ে। সংসারের খরচ জোগাতে একদিকে রাতের শিফটে চাকরি, অন্যদিকে পড়াশোনা—দুই দায়িত্বই সামলে আসছিলেন তিনি।
ইকনের পরিবারের শিকড় গোপালগঞ্জে হলেও তার বাবা ও দাদা চাকরিসূত্রে দীর্ঘদিন বাগেরহাটে বসবাস করেছেন। বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডে গাড়িচালক হিসেবে দাদার চাকরির সুবাদে পরিবারটি সেখানে বসতি গড়ে তোলে। অবসরের পর দাদা গোপালগঞ্জে ফিরে গেলেও ইকনের বাবা বাগেরহাটেই থেকে যান। বর্তমানে মা ও ভাইকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছে ইকনের পরিবার।





