জেড নিউজ ডেস্ক :
সময় উড়ে যায়, সময় ক্ষত সারায়, সময়ই টাকা—এমন অসংখ্য কথার মধ্য দিয়ে সময়কে আমরা প্রায়ই জীবনের স্বাভাবিক ও অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখি। সকাল হয়, রাত নামে; মাস শেষ হয়, বছর বদলায়। ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়। কিন্তু এই যে এক ঘণ্টা ৬০ মিনিটে, সপ্তাহ সাত দিন, বছর ১২ মাস, নির্দিষ্ট টাইম জোন, অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা—এসবের কোনোটিই প্রকৃতির বিধান নয়। এগুলো মানুষের তৈরি ব্যবস্থা। আর মানুষের তৈরি বলেই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শ্রমশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাজনীতি।
মানুষ বহু আগে থেকেই আলো-অন্ধকারের পরিবর্তন, ঋতুচক্র, জোয়ার-ভাটা, চাঁদের কলা ও নক্ষত্রের অবস্থান দেখে সময়ের হিসাব করেছে। কিন্তু সব সমাজ একইভাবে সময়কে ভাগ করেনি। কোথাও সূর্যের গতিপথ ছিল প্রধান ভিত্তি, কোথাও চাঁদের; আবার কোথাও সৌর ও চন্দ্র—দুই পদ্ধতির সমন্বয় ঘটেছে। সব ক্যালেন্ডারে মাসের দৈর্ঘ্য এক ছিল না, সব সমাজে সপ্তাহও সাত দিনের ছিল না। চার, ছয় কিংবা অন্য সংখ্যক দিনের সপ্তাহও ইতিহাসে ছিল।
আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ১২ মাস ও লিপইয়ারের ব্যবস্থা প্রচলিত হলেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে ভিন্ন ক্যালেন্ডার এখনো ব্যবহৃত হয়। যেমন ইহুদি, ইসলামি, পারস্য, থাই ও বিভিন্ন আঞ্চলিক ক্যালেন্ডার। বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক কাজে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হলেও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে হিজরি সন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে বাংলা সনের উপস্থিতি রয়েছে। অর্থাৎ একই সমাজে সময়ের একাধিক হিসাব পাশাপাশি চলতে পারে।
বোস্টন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলিজাবেথ কোহেনের ভাষায়, সময়ের প্রতিটি পরিমাপই এক অর্থে ইচ্ছানির্ভর বা নির্মিত। কোনো সময়সীমা এক সেকেন্ড কম বা বেশি, এক দিন আগে বা পরে নির্ধারণ করা যেত। প্রকৃতিতে ‘সকাল ৯টা’ বা ‘মাসের শেষ কর্মদিবস’ নামে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা নেই। তবু চাকরির সাক্ষাৎকার, ব্যাংকঋণের কিস্তি, পরীক্ষার সময়, আদালতের সময়সীমা কিংবা নির্বাচনের তফসিল—এসব ক্ষেত্রে ওই নির্ধারিত সময়ই মানুষের জীবনে বাস্তব ও কখনও কঠোর নিয়ামক হয়ে ওঠে।
প্রকৃতিনির্ভর সময় থেকে ঘড়িনির্ভর সময়ের বড় পরিবর্তন আসে শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে। কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষের কাজ প্রধানত নিয়ন্ত্রিত হতো প্রাকৃতিক সংকেতে। কখন বীজ বুনতে হবে, কখন ফসল তুলতে হবে, কখন গবাদিপশু মাঠে নিতে হবে—এসব নির্ধারণে সূর্যের অবস্থান, বৃষ্টি, ঋতু ও মাটির অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কৃষকের শ্রম কঠোর হলেও তা মিনিট ধরে বাঁধা ছিল না।
অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া শিল্পবিপ্লব সেই বাস্তবতা বদলে দেয়। কারখানায় উৎপাদন চালাতে দরকার হয় নির্দিষ্ট শিফট, নির্ধারিত হাজিরা, কাজের ঘণ্টা ও উৎপাদনসূচি। শ্রমিক কখন কারখানায় ঢুকবেন, কতক্ষণ কাজ করবেন, কখন বিরতি পাবেন—এসব নির্ধারণে ঘড়ি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র। ইতিহাসবিদ মাইকেল ও’ম্যালির মতে, শিল্পায়নের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে নিয়মিত ও অপরিবর্তনীয় সময়বোধ তৈরি করা। ঘড়ি তখন কেবল সময় দেখায় না; এটি কার কাজের ওপর কার কর্তৃত্ব থাকবে, তা-ও নির্ধারণ করে।
এই প্রভাব আজও স্পষ্ট। অফিসে দেরি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা, ওভারটাইম, রাতের শিফট, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ডেলিভারির সময়সীমা—সবই আধুনিক শ্রমবাজারে সময়কে পণ্য ও শৃঙ্খলার উপকরণে পরিণত করেছে। প্রযুক্তি এ প্রক্রিয়াকে আরও গভীর করেছে। স্মার্টফোন, ই-মেইল, অনলাইন মিটিং ও কর্মক্ষেত্রের চ্যাট প্ল্যাটফর্মের কারণে অনেকের কাছে অফিসের সময় আর শুধু অফিসে সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পরও ‘সবসময় অনলাইনে থাকা’র প্রত্যাশা তৈরি হয়।
টাইম জোনের ইতিহাসও ক্ষমতা ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। একসময় প্রতিটি শহর বা এলাকার স্থানীয় সময় ছিল সূর্যের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। সূর্য যখন কোনো শহরের মাঝ আকাশে থাকত, সেখানে তখন দুপুর ধরা হতো। এতে কাছাকাছি দুটি শহরের সময়েও কয়েক মিনিটের পার্থক্য থাকত। মানুষ যখন ধীরগতিতে চলাচল করত, তখন এ পার্থক্য বড় কোনো সমস্যা ছিল না।
কিন্তু রেলপথের বিস্তারের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন শহরভিত্তিক ৪০টির বেশি সময়মান চালু ছিল। এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া ট্রেনের সময়সূচি মিলিয়ে চলা তখন রেল কোম্পানিগুলোর জন্য জটিল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ১৮৮৩ সালের ১৮ নভেম্বর মার্কিন রেলওয়ে কোম্পানিগুলো নিজেদের উদ্যোগে দেশটিকে চারটি টাইম জোনে ভাগ করে। পরে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও টাইম জোনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশ্ব সময়ের ভিত্তি হিসেবে ইংল্যান্ডের গ্রিনিচকে বেছে নেওয়ার ইতিহাসও নিরপেক্ষ নয়। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত কল্পিত যে রেখা পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করে, সেটিই প্রাইম মেরিডিয়ান। ১৮৮৪ সালের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গ্রিনিচকে এই রেখার ভিত্তি ধরা হয়। নৃতত্ত্ববিদ কেভিন বার্থের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রিনিচকে বেছে নেওয়ার পেছনে কোনো বিশেষ ভৌগোলিক শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না; সিদ্ধান্তটি এসেছিল এমন সময়ে, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশ্ব রাজনীতি, নৌবাণিজ্য ও মানচিত্র নির্মাণে প্রভাবশালী শক্তি।
টাইম জোনের সীমানাগুলোও তাই কেবল ভূগোলের নিয়ম মেনে তৈরি হয়নি। তাত্ত্বিকভাবে পৃথিবীর ৩৬০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাকে ২৪ ঘণ্টায় ভাগ করলে প্রতিটি টাইম জোনের ব্যবধান হওয়ার কথা ১৫ ডিগ্রি। বাস্তবে দেশগুলোর সীমান্ত, প্রশাসনিক সুবিধা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সীমানাগুলো বাঁকানো ও অসমান।
চীনের উদাহরণ এ রাজনীতিকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দেশটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত হলেও সেখানে সরকারি হিসেবে একটি মাত্র টাইম জোন ‘বেইজিং সময়’ চালু রয়েছে। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। ফলে পূর্বাঞ্চলে সূর্য ওঠার কয়েক ঘণ্টা পর পশ্চিমাঞ্চলে আলো ফুটলেও আনুষ্ঠানিক সময় একই থাকে। পশ্চিমের অনেক মানুষ তাই দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় অনানুষ্ঠানিক স্থানীয় সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেন।
ডে-লাইট সেভিং টাইম বা গ্রীষ্মকালে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়ার বিতর্কও সময়ের রাজনীতির অংশ। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে বছরে দুইবার ঘড়ি পরিবর্তন করা হয়, যাতে সন্ধ্যার দিকে তুলনামূলক বেশি আলো পাওয়া যায়। সমর্থকেরা একে অবসর, ব্যবসা ও জ্বালানি ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। সমালোচকেরা বলেন, ঘড়ির এই পরিবর্তন মানুষের ঘুম, শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ও দৈনন্দিন রুটিনে বিঘ্ন ঘটায়। এ ব্যবস্থা স্থায়ী করা বা বাতিল করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত রাজনৈতিক বিতর্ক হয়। অর্থাৎ সূর্যের আলো কখন ব্যবহার করা হবে, সেটিও সামাজিক সিদ্ধান্ত; শুধুই প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়।
সময় আবার প্রতিবাদ ও দমন—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতে পারে। সরকার কারফিউ জারি করে নাগরিকের চলাচলের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কর্মক্ষেত্রে মালিকপক্ষ কঠোর সময়সীমা বা শিফটের মাধ্যমে শ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অন্যদিকে শ্রমিকেরা ধর্মঘট, কর্মবিরতি, ধীরগতির কাজ বা নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ না করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সময়কেই প্রতিরোধের হাতিয়ার বানান। রাজনৈতিক আন্দোলনেও ‘সময়’ গুরুত্বপূর্ণ। কখন সমাবেশ হবে, কতক্ষণ অবরোধ চলবে, কত দিনের আলটিমেটাম দেওয়া হবে এসব সিদ্ধান্ত আন্দোলনের শক্তি ও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
সময় তাই নিছক ঘড়ির কাঁটার চলাচল নয়। এটি মানুষকে একসঙ্গে কাজ করায়, রাষ্ট্রকে পরিচালনা সহজ করে, বাজারকে সমন্বয় করে এবং প্রযুক্তিকে কার্যকর করে। একই সঙ্গে এটি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করে, জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ব্যবহৃত হয় এবং ক্ষমতার সীমারেখা টানে।





