জেড নিউজ ডেস্ক :
গুহার অন্ধকারে এমন এক মাছের দেখা পাওয়া গেল, যা দেখে চকে ওঠেন বিজ্ঞানীরা। এই মাছের কোনো চোখ নেই, শরীরে কোনো রং নেই, পিঠ কিছুটা কুঁজো, শরীরের ওপর কাঁটার মতো রশ্মি আর নাক থাকলেও তা অন্য গুহামাছের চেয়ে একেবারেই আলাদা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্বচ্ছ ত্বকের নিচ দিয়ে এই মাছের মস্তিষ্ক পর্যন্ত দেখা যায়। অদ্ভুত এই মাছটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ডেমন কেভফিশ’। গবেষকদের ধারণা, মাছটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল মাছগুলোর একটি হতে পারে।
হরর সিনেমা বা কাল্পনিক সায়েন্স ফিকশনের কোনো অদ্ভুত জীব যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে বাস্তব পৃথিবীতে। আলাবামার একটি গুহায় ঢুকে ড. ম্যাথিউ নিমিলার যা খুঁজছিলেন, তা খুব একটা চমকপ্রদ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের হান্টসভিলের কাছে ববক্যাট গুহায় বিপন্ন আলাবামা গুহা চিংড়ি, দুই প্রজাতির গুহা কাঁকড়া এবং সাউদার্ন কেভফিশের অস্তিত্ব আগে থেকেই জানা ছিল। তাই গত বছর গুহাটির জীববৈচিত্র্য জরিপে গিয়ে নতুন কোনো চমকের আশা করেননি তিনি।
কিন্তু গুহার অন্ধকারে এমন এক মাছের দেখা পাওয়া গেল, যা দেখে চকে ওঠেন বিজ্ঞানীরা। এই মাছের কোনো চোখ নেই, শরীরে কোনো রং নেই, পিঠ কিছুটা কুঁজো, শরীরের ওপর কাঁটার মতো রশ্মি আর নাক থাকলেও তা অন্য গুহামাছের চেয়ে একেবারেই আলাদা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্বচ্ছ ত্বকের নিচ দিয়ে এই মাছের মস্তিষ্ক পর্যন্ত দেখা যায়। অদ্ভুত এই মাছটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ডেমন কেভফিশ’। গবেষকদের ধারণা, মাছটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল মাছগুলোর একটি হতে পারে।
গত বছরের জুলাইয়ে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ এই আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর তথ্য প্রকাশিত হয়। আর এ গল্পটি কোনো টানটান উত্তেজনার সিনেমার চেয়ে কম নয়।
যেভাবে মিলল এই অদ্ভুত মাছের খোঁজ
এ গল্পের শুরু হয়েছিল আলাবামার হান্টসভিলের কাছে অবস্থিত ‘ববক্যাট কেভ’ নামের একটি রহস্যময় গুহায়। ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার জীববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ম্যাথিউ নিমিলা যখন এই গুহায় জরিপ চালাতে যান, তখন তার মূল লক্ষ্য ছিল সেখানকার বিপন্ন প্রজাতির চিংড়ি ও সাধারণ গুহামাছ নিয়ে কাজ করা। কিন্তু গুহার পানিতে আলো ফেলতেই তিনি চমকে ওঠেন। তার চোখে পড়ে সম্পূর্ণ নতুন ও অদ্ভুত গড়নের এই মাছের দিকে।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি হয়তো পরিচিত কোনো গুহামাছের ভিন্ন রূপ। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখার পর তিনি এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো আবিষ্কার করেন। মাছটির শরীরে কোনো রঙের কণা বা পিগমেন্ট নেই। এর মুখের গড়ন ও কাঁটাযুক্ত পাখনা অন্য সব মাছের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
বিজ্ঞানীরা সাধারণত খোলা পানির ছোট মাছের শরীর এমন স্বচ্ছ দেখেন, যা তাদের শত্রুর হাত থেকে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। কিন্তু মাটির নিচের গভীর অন্ধকারে এমন একটি মাছের বিবর্তন বিজ্ঞানীদের দারুণভাবে চমকে দিয়েছে। মাছটির নিখুঁত শারীরিক গঠন ও কঙ্কালের ভিন্নতা নিশ্চিত করতে গবেষক দল ডিএনএ পরীক্ষা এবং সিটিস্ক্যানের সাহায্য নেন। ফলাফল বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হন, এটি কেবল একটি নতুন প্রজাতিই নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন একটি গণ বা বংশের অন্তর্ভুক্ত।
নেটফ্লিক্সের দানব থেকে নামকরণ
মাছটির অদ্ভুত আর ভুতুড়ে চেহারা দেখে বিজ্ঞানীরা এর বৈজ্ঞানিক নাম রেখেছেন ‘ডেমোগরগনিচথিস আরকানাস’ (Demogorgonichthys arcanus)। নামটি মূলত নেয়া হয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন সিরিজ ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর কুখ্যাত দানব ‘ডেমোগরগন’ থেকে।
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ড. জোনাথন আরমব্রাস্টার জানান, গভীর অন্ধকারের এই চোখহীন ও সাদাটে অদ্ভুত মাছটির নামকরণের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড বা পাতালপুরীর কোনো চরিত্রের চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারত না।
মাটির নিচের রহস্য ও ডেমন কেভফিশের অদ্যোপান্ত
এই ডেমন কেভফিশের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো খুব কম তথ্যই জানতে পেরেছেন। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর শুধু একটি স্থানেই এই মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, এর সংখ্যা খুবই কম। নিমিলার শেষবার গুহায় গিয়ে ২৭টি মাছ দেখেছেন। তবে এটিই পুরো জনসংখ্যা নয়। গবেষকদের মতে, ছোট ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে গুহাটিতে পানি প্রবেশ করে। ফলে মাছটির আবাসস্থলও সীমিত। এদিকে সংখ্যায় কম হলেও সুরক্ষিত পানির কারণে এরা টিকে থাকবে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।
আলাবামার একটি গুহার ভেতর লাইট ফেলে গবেষক ড. ম্যাথিউ নিমিলার অদ্ভুত ডেমন কেভফিশ দেখতে পান
এই মাছের প্রজনন সম্পর্কে এখনো প্রায় কিছুই জানা যায়নি। এমনকি পুরুষ ও স্ত্রী মাছ আলাদা করে শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি।
তবে সবচেয়ে আশা জাগানোর বিষয় হলো, ববক্যাট কেভ গুহাটি মার্কিন সেনাবাহিনীর ‘রেডস্টোন আর্সেনাল’ ঘাঁটির নিচে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। ফলে সুরক্ষিত পরিবেশের কারণে মাছটির বিলুপ্তির ঝুঁকি নেই বললেই চলে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই মাছগুলো আসলে কয়লা খনির ক্যানারি পাখির মতো পরিবেশের সতর্কবার্তা দেয়। গুহার ভূগর্ভস্থ পানি যদি কোনো কারণে দূষিত হয়, তবে সবার আগে এই মাছগুলো মারা যাবে। তাই এই বিরল মাছটিকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ হলো আমাদের নিজেদের বেঁচে থাকার পরিবেশকেও সুরক্ষিত রাখা।





