spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

ইসলামে ধনাঢ্যতা প্রশংসনীয়

জেড নিউজ , ঢাকা :

মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।

তাই ইসলাম মানুষকে দারিদ্র্যকে লক্ষ্য বানাতে বলেনি, আবার সম্পদ অর্জনকেও নিষিদ্ধ করেনি। বরং হালাল পথে উপার্জন করে স্বচ্ছল হওয়া, নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করা এবং আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা—ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় কাজ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সম্পদকে মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের সম্পদ অর্পণ করো না—যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জন্য জীবনের অবলম্বন করেছেন।

(সুরা : নিসা, আয়াত : ৫)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, সম্পদ নিজেই নিন্দনীয় কোনো বিষয় নয়। বরং আল্লাহ মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য সম্পদকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে দিয়েছেন। নিন্দনীয় হলো সম্পদের অপব্যবহার। অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন, তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।

’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

ইসলাম অলসতা ও পরনির্ভরশীলতাকে পছন্দ করেনা। তাই ইসলামে হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমরা পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে বিচরণ করো এবং তাঁর রিজিক থেকে আহার করো।’ (সুরা : মুলক, আয়াত :১৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও হালাল উপার্জনের মর্যাদা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেউ তার নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায়নি।

’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)

সুতরাং ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, কৃষি, চিকিৎসা, গবেষণা, শিল্প, প্রযুক্তি কিংবা অন্যান্য বৈধ পেশার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্মানজনক হতে পারে—যদি উপার্জনের পদ্ধতি শরিয়তসম্মত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪২৯)

এখানে ‘উপরের হাত’ দ্বারা দানকারীর হাত এবং ‘নিচের হাত’ দ্বারা গ্রহণকারীর হাত বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম এমন একটি সমাজ চায়, যেখানে মানুষ কেবল সাহায্য গ্রহণ করবে না; বরং সামর্থ্যবান হয়ে অন্যকে সাহায্য করার যোগ্যতা অর্জন করবে। এ কারণেই স্বচ্ছলতা একজন মুমিনের জন্য বড় নিয়ামত হতে পারে। কারণ সম্পদ থাকলে সে যাকাত দিতে পারে, সদকা করতে পারে, আত্মীয়-স্বজনের পাশে দাঁড়াতে পারে, অসহায় মানুষের সহযোগিতা করতে পারে এবং আল্লাহর পথে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈর্ষা করা যায় কেবল দুজনের ওপর: একজন হলো সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং সে তা সত্যের পথে ব্যয় করে; আর অন্যজন হলো সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী আমল করে ও তা অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩)

ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু সাহাবি ছিলেন যারা ছিলেন অত্যন্ত সম্পদশালী।  (রা.) ছিলেন বিপুল সম্পদের অধিকারী। কিন্তু তার সম্পদ তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং তিনি নিজের সম্পদ ইসলামের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তাবুক অভিযানের সময় তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও সামগ্রী দান করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার এই অবদানকে অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে গ্রহণ করেন। তেমনি  (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও ধনী সাহাবি। তার সম্পদ তাকে বিলাসী ও আত্মকেন্দ্রিক করেনি; বরং তিনি আল্লাহর পথে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করেছেন।

স্বচ্ছলতা প্রশংসনীয় হলেও সম্পদ অর্জনের পথ অবশ্যই বৈধ হতে হবে। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জুয়া, আত্মসাৎ, চুরি, অন্যের অধিকার নষ্ট করা কিংবা হারাম ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কখনো প্রশংসনীয় হতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে তা ভিন্ন কথা।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

ধন-সম্পদের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো অহংকার। মানুষ যখন মনে করতে শুরু করে—‘আমিই বড়, আমার সম্পদই আমার শক্তি’—তখন সম্পদ তার জন্য পরীক্ষায় পরিণত হয়। কারূনের ঘটনা কোরআনে এ কারণেই আমাদের জন্য শিক্ষা। সে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে অহংকার করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কারূন ছিল মূসার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু সে তাদের প্রতি সীমালঙ্ঘন করেছিল। আর আমি তাকে এত ধনভাণ্ডার দিয়েছিলাম যে, তার চাবিগুলো বহন করাই শক্তিশালী একদল লোকের জন্য কষ্টকর ছিল।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৬)

সুতরাং ইসলাম দারিদ্র্যকে কোনো ইবাদত বানায়নি, আবার সম্পদকেও কোনো অপরাধ হিসেবে দেখেনি। বরং ইসলাম চায়—মুসলিম হালাল পথে উপার্জন করবে, স্বচ্ছল হবে, নিজের পরিবারকে সম্মানের সঙ্গে পরিচালনা করবে, জাকাত আদায় করবে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে এবং আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করবে। তাই ধন-সম্পদের ব্যাপারে ইসলামের শিক্ষা হলো—সম্পদ অর্জন করো, কিন্তু হারাম পথে নয়; স্বচ্ছল হও, কিন্তু অহংকারী হয়ো না; উপভোগ করো, কিন্তু অপচয় করো না; সঞ্চয় করো, কিন্তু কৃপণ হয়ো না; আর সম্পদকে ভালোবাসার পরিবর্তে সম্পদকে ভালো কাজে ব্যবহার করো।

 

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল ও প্রশস্ত রিজিক দান করুন, সেই রিজিকে বরকত দিন এবং তা তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়