spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

দেড়শ বছর পর পাওয়া গেল ডারউইনের অনুমানের সত্যতা!

জেড নিউজ ডেস্ক :   

চার্লস ডারউইন একটি নির্দিষ্ট গোত্রের গাছের গায়ে আটকে থাকা পোকা দেখে দেড়শ বছর আগেই সন্দেহ করেছিলেন, গাছটি কি তবে পোকাখেকো? তখন তার হাতে সেই ধারণা প্রমাণ করার মতো প্রযুক্তি ছিল না। ১৮৭৫ সালে করা সেই অনুমানই এবার আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম শুধু পোকা আটকে রাখে না, সেগুলো হজম করে তাদের শরীরের পুষ্টিও গ্রহণ করে।

যে প্রশ্নের উত্তর পেতে লেগেছে দেড়শ বছর

ডারউইন স্যাক্সিফ্রাগা গোত্রের কয়েকটি গাছের পাতায় আঠালো লোমের মতো গঠন দেখেছিলেন। এসব গঠন থেকে বের হওয়া আঠালো পদার্থে ছোট পোকা আটকে যেত। তার ধারণা ছিল, গাছগুলো হয়তো পোকা খায়। কিন্তু কোনো গাছের গায়ে পোকা আটকে গেলেই তাকে মাংসাশী উদ্ভিদ বলা যায় না। পোকাকে আকৃষ্ট করা, আটকে রাখা, হজম করা এবং তার পুষ্টি শোষণ করা—এ সবকিছুর জন্যই প্রমাণ প্রয়োজন।

নতুন গবেষণায় সেই প্রমাণই মিলেছে। চীনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায় জন্মানো স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম নিয়ে পরীক্ষা চালান বিজ্ঞানীরা। গাছটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ মিটার উচ্চতায় শুষ্ক, পাথুরে ও পুষ্টিহীন মাটিতে জন্মায়।

গবেষকেরা দেখেন, একটি গাছে কয়েক ডজন ছোট মাছি আটকে আছে। কোনো কোনো গাছে এমন পোকা ছিল প্রায় ৭০টি পর্যন্ত। ফুল থেকে বের হওয়া বিশেষ গন্ধ এসব পোকাকে আকৃষ্ট করে। তবে বড় মাছিগুলো, যারা ফুলের পরাগায়নে ভূমিকা রাখে, সাধারণত আটকে যায় না। 

পোকা আটকালেই শেষ নয়

আটকে পড়া পোকাগুলোর দেহ গাছটি ফসফাটেজ নামের একটি এনজাইম দিয়ে ভেঙে ফেলে। এরপর সেখান থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে। বিজ্ঞানীরা পোকাদের দেহে নাইট্রোজেন-১৫ ব্যবহার করে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, সেই পুষ্টি সরাসরি পোকা থেকে গাছের শরীরে যাচ্ছে।

গাছ সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের খাবার তৈরি করতে পারে। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য নাইট্রেটের মতো পুষ্টিও প্রয়োজন। স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম যে মাটিতে জন্মায়, সেখানে এসব পুষ্টি খুব কম। ফলে পোকা খেয়ে পুষ্টি সংগ্রহ করা গাছটির জন্য এক ধরনের অভিযোজন হতে পারে।

এখানেই গাছটির বিশেষত্ব। সাধারণত মাংসাশী উদ্ভিদের কথা উঠলে জলাভূমির কলস উদ্ভিদ বা ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের কথা মনে পড়ে। কিন্তু এই গাছ জন্মায় শুষ্ক ও উঁচু পাহাড়ে। গবেষকদের মতে, মাংসাশী উদ্ভিদের জন্য এমন পরিবেশের নজির আগে দেখা যায়নি।

ডারউইনের ধারণা খুলে দিল নতুন দরজা

গবেষকেরা জিনগত বিশ্লেষণেও এমন কিছু জিন শনাক্ত করেছেন, যেগুলো পোকা আকর্ষণ, হজম এবং পুষ্টি শোষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন ধরনের পোকা ধরার ফাঁদ নিয়ে আরো গবেষণায় উদ্ভিদের বিভিন্ন গোত্রে পোকামাকড়ের দেহ হজমের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু জিনের সন্ধানও পাওয়া গেছে।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক হাং সানের ধারণা, যেসব উদ্ভিদকে এত দিন শুধু আঠালো লোমযুক্ত বা দুর্ঘটনাবশত পোকা আটকে ফেলে বলে মনে করা হয়েছে, তাদের কিছু প্রজাতির মধ্যেও হয়তো পোকা হজম ও পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা রয়েছে।

অর্থাৎ আমাদের চোখের সামনেই হয়তো আরো অনেক পোকাখেকো উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের পরিচয় এখনো জানা হয়নি।

 ডারউইনের আরেক অনুমানও সত্য হয়েছিল

এটি ডারউইনের কোনো ধারণা পরে সত্য প্রমাণিত হওয়ার প্রথম ঘটনা নয়। ১৮৬২ সালে মাদাগাস্কারের একটি অর্কিড দেখে তিনি ধারণা করেছিলেন, এর প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ মধুনালি নিশ্চয়ই এমন কোনো বিশাল মথের জন্য তৈরি, যার শুঁড়ও অস্বাভাবিক লম্বা।

ডারউইনের জীবদ্দশায় সেই মথের সন্ধান মেলেনি। তার মৃত্যুর ২১ বছর পর, ১৯০৩ সালে আবিষ্কৃত হয় সেই মথ। এর শুঁড়ের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার। ডারউইনের অনুমান সঠিক প্রমাণিত হয়।

স্যাক্সিফ্রাগার ক্ষেত্রেও যেন একই ইতিহাস ফিরে এল। দেড়শ বছর আগে প্রকৃতিকে দেখে ডারউইন যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আধুনিক প্রযুক্তি এবার তার উত্তর দিল।

পৃথিবীতে অন্তত ৩ লাখ ৫০ হাজার প্রজাতির ফুলগাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৭৫০টির বেশি প্রজাতিকে এখন পর্যন্ত মাংসাশী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই তালিকা ভবিষ্যতে আরো বড় হতে পারে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানী সুসান মায়ার্সের ভাষায়, উদ্ভিদজগত সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনো কেবল পৃষ্ঠ ছুঁয়েছে। দেড়শ বছর আগের একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন যেন সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিল যে গাছপালার জগতে এখনো অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে।

 

—সিএনএন থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়