জেড নিউজ ডেস্ক :
পরকীয়া শব্দটি আজ অনেকটা সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ভয়াবহ পরিণতি বারবার ভাবতে বাধ্য করছে কেন মানুষ পরকীয়ায় জড়ান। সত্যিই কি শুধু জৈবিক চাহিদা মেটানো, একঘেয়েমি কাটানো, দাম্পত্য টানাপড়েন, মানসিক প্রশান্তি নাকি মানসিক বিকৃতি।
কিন্তু মনোবিজ্ঞানী ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুখী দম্পতিরাও পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছেন। আসলে এর পেছনে অনেক মনস্তত্ব কাজ করেন। মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন থেকেই এই বিষয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন? শুধু মানুষ নয়, প্রাণীদের মধ্যেও পরকীয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। আসলে প্রাণীদের বিষয়টি আসলে মানুষের সংজ্ঞায় ঠিক পরকীয়া বলা যায় কি না তাও একটা প্রশ্ন। আচ্ছা পরকীয়া কী? পরকীয়া বলতে সাধারণত বোঝানো হয়, সম্পর্কে থাকা অবস্থায় নিজের সঙ্গীর বাইরে অন্য কারো সঙ্গে প্রেম বা যৌনসম্পর্কে জড়ানো।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক প্রাণী সামাজিকভাবে একগামী বা মনোগামিস জুটি হিসেবে বসবাস করলেও যৌন আচরণের ক্ষেত্রে তারা সবসময় একনিষ্ঠ থাকে না। অর্থাৎ একটি প্রাণী একটি সঙ্গীর সঙ্গে বাসা বানাতে পারে, সন্তান লালন-পালন করতে পারে, কিন্তু প্রজননের ক্ষেত্রে অন্য সঙ্গীর সঙ্গেও মিলিত হতে পারে।
যেসব প্রাণীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-
পাখিদের মধ্যে বিষয়টি বেশ পরিচিত
প্রাণীদের মধ্যে এক্সট্রা-পেয়ার মেটিং-এর সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পাওয়া যায় পাখিদের ক্ষেত্রে। বহু পাখির প্রজাতি সামাজিকভাবে একগামী। একটি পুরুষ ও একটি নারী জুটি বেঁধে বাসা তৈরি করে, ডিমে তা দেয় এবং ছানাদের বড় করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ডিমের সব ছানার জৈবিক বাবা সেই জুটির পুরুষটিই।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পাখির ক্ষেত্রে স্ত্রী পাখি তার সামাজিক সঙ্গীর বাইরে অন্য পুরুষের সঙ্গেও সঙ্গম করতে পারে। এর ফলে বাসায় এমন ছানার জন্ম হতে পারে, যার জৈবিক বাবা সামাজিক বাবা নয়। এই ঘটনাকে এক্সট্রা-পেয়ার পেটারনিটি বা অন্য জুটির পিতৃত্ব বলা হয়।
প্রাণীদের মধ্যে এক্সট্রা-পেয়ার মেটিং-এর সবচেয়ে বেশি উদাহরণ পাওয়া যায় পাখিদের ক্ষেত্রে
অস্ট্রেলিয়ার সুপার ফেইরি-রেন পাখিদের এ ধরনের আচরণ দেখা যায়। এরা সামাজিকভাবে জুটি বেঁধে থাকে এবং ছানা লালন-পালনে পুরুষ ও নারী উভয়েই অংশ নেয়। কিন্তু জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাসার অনেক ছানার জৈবিক বাবা সেই সামাজিক জুটির পুরুষ নয়। অর্থাৎ সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রজনন সম্পর্ক সবসময় এক নয়। এক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ-উভয় পাখি তাদের অন্য সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বাচ্চার জন্ম দেয়।
হাঁসের মধ্যেও রয়েছে সঙ্গীর বাইরে সঙ্গমের উদাহরণ
ম্যালার্ড হাঁসের আচরণও এ ক্ষেত্রে বেশ চমকপ্রদ। এরা জোড়ায় থাকে, জোড়ায় বসবাস করে। এমনকি প্রজনন মৌসুমে পুরুষ ও নারীকে একসঙ্গে দেখা যায়। কিন্তু গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জুটি থাকা সত্ত্বেও পুরুষ হাঁসটি অন্য নারী হাঁসের সঙ্গে সঙ্গম করার চেষ্টা করে। এ ধরনের আচরণ প্রাণীদের প্রজনন কৌশলের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বাইরে থেকে কোনো প্রাণীকে ‘একগামী’ মনে হলেও তাদের যৌন আচরণ আরও জটিল।
বানরজাতীয় প্রাণীর মধ্যেও পরকীয়ার প্রমাণ মিলেছে
শুধু পাখিরাই নয়, প্রাইমেট বা বানরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যেও অন্য কারো সঙ্গে সঙ্গমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালে ন্যাচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বন্য জেলাডা বানরের সঙ্গম আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকরা একটি বানরের এক হাজারের বেশি বার সঙ্গমের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখেন, এর একটি অংশ ছিল তার সঙ্গীর বাইরে।
গবেষণাটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কিছু ক্ষেত্রে এসব সঙ্গম এমনভাবে ঘটেছিল যাতে সঙ্গীর নজরে না পড়ে। এতে বোঝা যায়, প্রাণীদের যৌন আচরণ শুধু সঙ্গী নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক অবস্থান, প্রতিযোগিতা এবং অন্য প্রাণীর নজর এড়িয়ে চলার বিষয়ও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।জেলাডা বানর সঙ্গীর নজর এড়িয়ে অন্য বানরের সঙ্গে সঙ্গমে মিলিত হয়
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যেও একনিষ্ঠতা সবসময় নেই
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যেও সামাজিক একগামিতা এবং যৌন একগামিতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ২০২০ সালে সাইন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জোড়ায় বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সামাজিকভাবে জোড়ায় বসবাস করা প্রাণীদের মধ্যে সম্পূর্ণ জেনেটিক একগামীতা তুলনামূলকভাবে বিরল। অর্থাৎ কোনো প্রাণী দীর্ঘদিন একটি সঙ্গীর সঙ্গে বসবাস করছে, একসঙ্গে সন্তান লালন-পালন করছে এমন দৃশ্য দেখলেই ধরে নেওয়া যায় না যে তার প্রজনন সম্পর্কও সম্পূর্ণ একনিষ্ঠ। সন্তানের পিতা এদের আলাদা।
প্রাণীরা কেন এমন করে?
বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে বিভিন্ন বিবর্তনগত কারণ থাকতে পারে। অন্য সঙ্গীর সঙ্গে সঙ্গম করলে কোনো প্রাণী নিজের জিন পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। আবার স্ত্রী প্রাণীর ক্ষেত্রে অন্য পুরুষের সঙ্গে সঙ্গম করলে সন্তানদের জিনগত বৈচিত্র্য বাড়তে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে শক্তিশালী বা ভালো জিনগত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী পুরুষকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে প্রতিটি প্রাণীর ক্ষেত্রে কারণ একই-এমনটি বলা যায় না। প্রজাতি, পরিবেশ, সামাজিক কাঠামো এবং খাদ্য ও প্রজননের পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ বদলে যেতে পারে।
তবে এটাকে মানুষের ‘পরকীয়া’র সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো ঠিক নয়। এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। মানুষের পরকীয়ার সঙ্গে ভালোবাসা, আবেগ, প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ এবং সম্পর্কের নানা বিষয় জড়িয়ে থাকে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে গবেষকরা সাধারণত এসব আচরণকে মানুষের মতো নৈতিক ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখেন না।
তাই বিজ্ঞানসম্মতভাবে বলা ভালো অনেক প্রাণীর মধ্যে সামাজিক জুটির বাইরে যৌনসম্পর্কের প্রবণতা রয়েছে, কিন্তু সেটিকে মানুষের ‘পরকীয়া’ বলার চেয়ে এক্সট্রা-পেয়ার মেটিং বলা বেশি সঠিক হবে।





