জেড নিউজ ডেস্ক :
পোকাটি গাছের বাকল ভেদ করে ভেতরে ছোট ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করে। কিন্তু আসল বিপদ শুধু পোকার কামড়ে নয়। এর সঙ্গে থাকে এক ধরনের ছত্রাকের স্পোর, যা গাছের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে
তিলের দানার চেয়েও ছোট একটি গুবরে পোকা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় পলিফ্যাগাস শট-হোল বোরার নামের এ পোকা এখন অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সব মহাদেশেই শনাক্ত হয়েছে। কাঠের পণ্য, জীবন্ত গাছ, প্যাকেজিং উপকরণ ও জ্বালানি কাঠের সঙ্গে অজান্তেই এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে এটি। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ—দুই ধরনের জলবায়ুতেই টিকে থাকতে পারার ক্ষমতা থাকায় ভবিষ্যতে এর বিস্তারের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
পোকাটির আকার ক্ষুদ্র হলেও এর ক্ষতি ব্যাপক। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৮০ প্রজাতির গাছ ও কাঠজাত উদ্ভিদে এর আক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। ওক, অ্যাভোকাডো, ম্যাপল, বক্স এল্ডারসহ ফলজ, বনজ ও শহুরে ছায়াদানকারী গাছ এর শিকার হচ্ছে। স্পেন, উরুগুয়ে ও তুরস্কে ২০২২ সালের পর থেকে এ পোকার স্থায়ী উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এটি আগে থেকেই রয়েছে; গবেষকদের আশঙ্কা, সেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্র, পূর্ব মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার কিছু অঞ্চলেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। আফ্রিকার আরও উত্তরে এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলজুড়েও বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে।
পোকাটি গাছের বাকল ভেদ করে ভেতরে ছোট ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করে। কিন্তু আসল বিপদ শুধু পোকার কামড়ে নয়। এর সঙ্গে থাকে এক ধরনের ছত্রাকের স্পোর, যা গাছের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। ছত্রাকটি গাছের পানি ও পুষ্টি পরিবহনের নালি বন্ধ করে দেয়। ফলে আক্রান্ত গাছ খরার মতো লক্ষণ দেখিয়ে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে মারা পড়ে। ওক গাছ কয়েক বছরের মধ্যে মরে যেতে পারে, কিছু গাছ আবার এক বছরের মধ্যেই টিকতে পারে না।
এটিকে গবেষকেরা ‘পারফেক্ট ইনভেডার’ বা আদর্শ আক্রমণকারী প্রজাতি বলছেন। কারণ স্ত্রী পোকা পুরুষ ছাড়াই প্রজনন শুরু করতে পারে। পরে তাদের উৎপাদিত পুরুষ সন্তানের সঙ্গে মিলনের মাধ্যমে দ্রুত নতুন উপনিবেশ গড়ে ওঠে। কাঠের ভেতরে লুকিয়ে থাকার কারণে সীমান্ত ও বন্দরনির্ভর উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য তদারকিও অনেক সময় একে শনাক্ত করতে পারে না।
দক্ষিণ আফ্রিকা এ পোকার ভয়াবহতার বড় উদাহরণ। দেশটির নয়টি প্রদেশের আটটিতে এটি শনাক্ত হয়েছে। ২০২২ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, আগামী এক দশকে পোকাটির কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি ২৭ হাজার ৫০০ কোটি র্যান্ড, বা প্রায় ১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। শহরের অসংখ্য গাছ কেটে অপসারণ, পুনরায় রোপণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবুজ আচ্ছাদন কমে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খরচ এর সঙ্গে যুক্ত হবে।
আক্রান্ত গাছ দ্রুত কেটে ফেলা ও কাঠ নিরাপদে নষ্ট করাই এখন প্রধান কৌশল। তবে একবার খোলা পরিবেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে এ পোকার সম্পূর্ণ নির্মূল প্রায় অসম্ভব। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস সীমিত এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সংক্রমণ ঠেকাতে পারলেও অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে কয়েক বছর ধরে ব্যয়বহুল অভিযান চালিয়েও এর বিস্তার থামানো যায়নি।
রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণও খুব কার্যকর হয়নি। কারণ গাছের ভেতরের নালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওষুধ পোকার কাছে পৌঁছায় না। গবেষকেরা এখন পরজীবী বোলতা, মাইট ও নেমাটোডের মতো জীবন্ত নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা করছেন। তবে পরীক্ষাগারের সাফল্য মাঠপর্যায়ে কার্যকর হবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন অঞ্চল এ পোকার জন্য উপযোগী হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।





