জেড নিউজ , ঢাকা :
মানুষের সৌন্দর্য শুধু তার পোশাক, চেহারা কিংবা বাহ্যিক সাজসজ্জায় নয়; বরং তার চরিত্র, আচরণ ও অন্তরের পবিত্রতাতেই প্রকৃত সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে। আর এই সৌন্দর্যের অন্যতম অলংকার হলো শালীনতা ও লজ্জাশীলতা।
শালীনতা একজন মুমিনের ঈমান ও আত্মিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তরেরও বেশি—অথবা ষাটেরও বেশি—শাখা রয়েছে। এর সর্বোচ্চ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, লজ্জাশীলতা কোনো তুচ্ছ সামাজিক গুণ নয়। এটি ঈমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন মানুষের ঈমান যত শক্তিশালী হয়, তার আচরণেও তত বেশি শালীনতা, সংযম ও বিনয় প্রকাশ পাওয়ার কথা।
শালীনতা এমন একটি অন্তর্গত শক্তি, যা মানুষকে ভালো কাজের দিকে এগিয়ে দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।
শালীনতা সহজাতও হতে পারে, অর্জিতও হতে পারে
শালীনতার কিছু অংশ আল্লাহ মানুষের স্বভাবের মধ্যে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ছোট শিশুর মধ্যেও অনেক সময় লজ্জাবোধ দেখা যায়। এটি মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাতের অংশ। তবে পরিবেশ, প্রবৃত্তি ও পাপের অভ্যাসের কারণে এই স্বাভাবিক লজ্জাবোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তখন আত্মসংযম, ঈমানের চর্চা, নেক সঙ্গ এবং আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে শালীনতাকে পুনরায় অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। একজন মানুষ যখন বারবার নিজেকে সংযত করে, অশ্লীলতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, অশোভন কথা বলা থেকে বিরত থাকে এবং গোপনেও আল্লাহকে ভয় করে—তখন ধীরে ধীরে শালীনতা তার চরিত্রের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।
শালীনতা শুধু পোশাকে নয়
অনেকে শালীনতাকে শুধু পোশাকের সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করেন। অথচ ইসলামে শালীনতার পরিধি অনেক বিস্তৃত। শালীনতা রয়েছে চোখে—যখন মানুষ হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচায়। শালীনতা রয়েছে কথায়—যখন মানুষ অশ্লীল, কটু ও অপমানজনক কথা বলা থেকে বিরত থাকে। শালীনতা রয়েছে আচরণে—যখন মানুষ অন্যের সম্মান ও অধিকার রক্ষা করে। শালীনতা রয়েছে পোশাকে—যখন পোশাক মর্যাদা, সতর ও সৌন্দর্যের সীমা রক্ষা করে। শালীনতা রয়েছে সামাজিক যোগাযোগেও—যখন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত জীবন, ছবি, অনুভূতি ও কথাবার্তা প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংযমী থাকে। আর সর্বোপরি শালীনতা রয়েছে অন্তরে—যখন মানুষ নির্জনেও আল্লাহকে ভয় করে।
শালীনতা মানুষকে তার দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে
মুমিন জানে, তার ওপর আল্লাহর অধিকার রয়েছে। একইভাবে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষেরও অধিকার রয়েছে। শালীনতা তাকে দায়িত্বহীন হতে দেয় না। বরং সে মনে করে—আমি আমার রবের কাছে দায়বদ্ধ। ফলে সে ইবাদতে যত্নবান হয়, মানুষের হক আদায় করে, অন্যায় থেকে দূরে থাকে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা : নাহল, ১৬ : ৯০
প্রবৃত্তির টানে শালীনতাই হতে পারে ঢাল
মানুষের ভেতরে নানা প্রবৃত্তি রয়েছে। কখনো অর্থের লোভ, কখনো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, কখনো কামনা-বাসনা তাকে অন্যায়ের দিকে টেনে নেয়। তখন ঈমান ও শালীনতা তার জন্য ঢালের মতো কাজ করে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে—এই কাজ কি আল্লাহ পছন্দ করবেন? এর পরিণতি কী? কিয়ামতের দিন আমি কী জবাব দেব? এই আত্মজিজ্ঞাসাই তাকে অনেক পাপ থেকে রক্ষা করতে পারে।
নারীর সৌন্দর্যেও শালীনতার বিশেষ ভূমিকা
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই শালীনতা ও পবিত্রতার শিক্ষা দিয়েছে। বিশেষ করে নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিত্ব রক্ষায় শালীনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং নিজেদের সৌন্দর্য ও শালীনতা রক্ষা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
তবে এটি শুধু নারীর জন্য নয়; পুরুষের জন্যও দৃষ্টি, পোশাক, আচরণ ও কথাবার্তায় শালীনতা রক্ষা করা অপরিহার্য। কোরআন প্রথমে মুমিন পুরুষদেরই দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ দিয়েছে। তাই শালীনতা কোনো এক লিঙ্গের দায়িত্ব নয়; বরং এটি মুমিন নারী-পুরুষ উভয়ের চরিত্রের অলংকার।
লজ্জা হারিয়ে গেলে মানুষের কী হয়?
লজ্জাবোধ মানুষের অন্তরের একটি প্রহরীর মতো। এই প্রহরী দুর্বল হয়ে গেলে মানুষ ধীরে ধীরে এমন কাজেও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যেগুলো একসময় তার কাছে লজ্জার ছিল। আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ ব্যবহার, অশ্লীল বিনোদন, ব্যক্তিগত জীবনের অতিরিক্ত প্রকাশ এবং অশোভন ভাষার প্রচলন মানুষের লজ্জাবোধকে দুর্বল করার বড় কারণ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যখন তোমার লজ্জা থাকবে না, তখন তুমি যা ইচ্ছা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪৮৪)
অর্থাৎ লজ্জাবোধ হারিয়ে গেলে মানুষ পাপের ব্যাপারে আর কোনো অন্তর্গত বাধা অনুভব করে না।
শালীনতা মানে দুর্বলতা নয়
কেউ কেউ মনে করেন, বেশি লজ্জাশীল মানুষ হয়তো দুর্বল বা আত্মবিশ্বাসহীন। এটি সঠিক নয়। প্রকৃত শালীনতা দুর্বলতা নয়; বরং নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি। অন্যকে অপমান করা সহজ, কিন্তু সম্মান করা চরিত্রের শক্তি। অশ্লীল কথা বলা সহজ, কিন্তু জিহ্বাকে সংযত রাখা আত্মশক্তির পরিচয়। গোপনে পাপ করা সহজ, কিন্তু আল্লাহর ভয়ে তা ছেড়ে দেওয়া প্রকৃত সাহস। তাই শালীনতা মানুষকে দুর্বল নয়, বরং মর্যাদাবান ও আত্মনিয়ন্ত্রিত করে।
যেভাবে শালীনতার চর্চা করবো
১. আল্লাহর সর্বক্ষণিক নজরদারির কথা স্মরণ করা।
২. চোখকে হারাম দৃষ্টি থেকে হেফাজত করা।
৩. কথাবার্তায় অশ্লীলতা ও কটু ভাষা পরিহার করা।
৪. পোশাকে ইসলামী শালীনতা ও মর্যাদা বজায় রাখা।
৫. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সংযমী হওয়া।
৬. নেককার ও শালীন মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা।
৭. অশ্লীল বিনোদন ও পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
৮. প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া।
৯. হালাল-হারাম মেনে জীবন-যাপন করা।
১০. আল্লাহর কাছে লজ্জাশীল ও পবিত্র চরিত্রের জন্য দোয়া করা।
শালীনতা মানুষের চরিত্রের এমন এক অলংকার, যা তাকে আল্লাহর কাছে প্রিয় এবং মানুষের কাছে সম্মানিত করে তোলে। এটি শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; বরং ঈমানের একটি শাখা এবং একজন মুমিনের অন্তরের জীবন্ত অবস্থার পরিচায়ক।





