জেড নিউজ ডেস্ক :
বার্লিনের নয়ে ন্যাশনাল গ্যালারিতে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হচ্ছেন দর্শকরা। গ্যালারিজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে যান্ত্রিক কুকুরের দল। সাধারণ রোবট কুকুরের সঙ্গে এদের পার্থক্য আছে। তা হলো ঘাড়ের ওপর বসানো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি মোগলদের মাথা।
ইলোন মাস্ক, মার্ক জাকারবার্গ, জেফ বেজোস থেকে শুরু করে শিল্পী পাবলো পিকাসো কিংবা অ্যান্ডি ওয়ারহোল—কারো মাথা বাদ যায়নি। মার্কিন শিল্পী বিপলের এ প্রদর্শনীর নাম ‘রেগুলার অ্যানিম্যালস’, যা এর আগে ২০২৫ সালের আর্ট ব্যাসিল মায়ামি বিচে প্রদর্শিত হয়।
রোবট কুকুরগুলো শুধু প্রদর্শনীতে অলসভাবে ঘুরে বেড়ায়, এমন নয়। এদের প্রতিটি নড়াচড়া এবং কার্যক্রম সুপরিকল্পিত। প্রতিটি কুকুরের সঙ্গে রয়েছে অত্যাধুনিক ক্যামেরা। তারা চারপাশের দর্শক ও পরিবেশের ছবি তোলে এবং সেই ছবিগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রসেস করে।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ছবিগুলো প্রসেস করার পর কুকুরগুলো সেগুলো প্রিন্ট করে বের করে দেয়। বিপল বিদ্রূপের ছলে একে বলছেন ‘পুইং’ বা মলত্যাগ। অর্থাৎ, টেক মোগলদের মস্তিষ্ক দিয়ে পৃথিবীটা দেখার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা বিপলের চোখে স্রেফ ‘ডিজিটাল বর্জ্য’।
জাকারবার্গ বা মাস্কের কুকুরের ছবিগুলোয় প্রতিফলিত হয় বর্তমানের টেক-অ্যালগরিদমের এক জটিল ও যান্ত্রিক রূপ। অন্যদিকে পিকাসো বা ওয়ারহোলের কুকুরের তোলা ছবিতে দেখা যায় কিউবিজম বা পপ-আর্টের শৈল্পিক ছোঁয়া।
প্রদর্শনীটির মাধ্যমে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন বিপল— দুনিয়াকে দেখার ক্ষমতা কি এখন আমাদের হাতে আছে? তিনি বলেন, ‘অতীতে শিল্পীরা আমাদের জগতকে দেখার নতুন চোখ দিতেন। কিন্তু আজ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করছে টেক বিলিয়নেয়ারদের তৈরি অ্যালগরিদম। তারা চাইলে কোনো কংগ্রেস বা জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়াই এক নিমেষে কোটি কোটি মানুষের ফিড বদলে দিতে পারেন, যা আমাদের চিন্তা ও মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
এ প্রদর্শনী মূলত সেই ‘অসীম ক্ষমতার’দিকে আঙুল তোলে, যা মাস্ক বা জাকারবার্গের মতো ব্যক্তিদের হাতে রয়েছে। তারা যা দেখাতে চান, আমরা তাই দেখি।
দর্শকদের উপহার দেয়ার মাধ্যমে বিপল তার এ রসিকতাকে একধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। রোবট কুকুররা যেসব ছবি প্রিন্ট বা ‘ত্যাগ’ করে, তার সঙ্গে তিনি একটি মজার সনদ জুড়ে দেন। সেখানে লেখা থাকে— শতভাগ অর্গানিক জিএমও-মুক্ত কুকুরের বিষ্ঠা!
বিষ্ঠা বা বর্জ্য হিসেবে গণ্য করা কিছু প্রিন্টের সঙ্গে রয়েছে কিউআর কোড, যা দিয়ে দর্শকরা বিনামূল্যে এনএফটি সংগ্রহ করতে পারছেন। দর্শকরা চাইলে এ ডিজিটাল আর্টকে পরবর্তীতে মুদ্রায় রূপান্তর করতে পারবেন।
বিপল বা মাইক উইঙ্কেলম্যান কেবল একজন গ্রাফিক ডিজাইনার নন, তিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দামী তিন শিল্পীর একজন। তার ডিজিটাল আর্ট এর আগে ৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে ইতিহাস গড়েছে।
বার্লিনে চলমান প্রদর্শনীর কিউরেটর লিসা বত্তি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ আমাদের জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে। আর মিউজিয়াম হলো সেই জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে সমাজ ও প্রযুক্তির এ অদ্ভুত পরিবর্তন নিয়ে ভাবার সুযোগ দেয়া যায়।
বিপলের প্রদর্শনীটি দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা হয়তো এখন এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে আমাদের চিন্তা আর আবেগগুলো বড় বড় টেক জায়ান্টদের অ্যালগরিদমের কাছে স্রেফ কিছু ‘ডাটা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।



