১৯/০৪/২০২৬, ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    বিবিসির সঙ্গে তারেক রহমানের বক্তব্য অত্যন্ত রাষ্ট্রনায়কোচিত

    আমিরুল ইসলাম কাগজী

    বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি বিবিসির সঙ্গে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শান্ত, সংযত ও যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নপথ নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি। তার বক্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাস, বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নেতৃত্বের পরিপক্বতা—যা অনেকের কাছে রাষ্ট্রনায়কোচিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাস্টারমাইন্ড কে? সে ব্যাপারে অসাধারণ মন্তব্য দিয়েছেন তারেক রহমান। তুমি স্পষ্ট করেই বলেছেন আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ। ফ্যাসিবাদি শাসককে উৎখাত করার জন্য একক কোন ব্যক্তি কিংবা দল মাঠে নামলে আন্দোলন সফল হতো না। ছাত্র জনতা কৃষক শ্রমিক সর্বস্তরের মানুষ তাদের সহ-সহ অবস্থান থেকে আন্দোলনে শরিক হওয়ার কারণে শেখ হাসিনার মত দোর্দণ্ডপ্রতাপশালি শাসক ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের যে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সেটা ফুটে উঠেছে বিবিসির সাক্ষাৎকারে। আগামী নির্বাচনে কিভাবে তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করবে, আন্দোলনকারী শরিক দলগুলোকে কিভাবে সমন্বয় করা হবে তারও একটা রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন সেখানে। বিগত ১৭টি বছর তিনি মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চলার দক্ষতা তাকে পাকাপোক্ত রাজনৈতিক নেতায় পরিণত করেছে। যখন যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেটার ব্যাপারে তখনই তিনি সঠিক বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। দলীয় কর্মসূচি প্রণয়ন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন সে ব্যাপারে তিনি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি হয়তো স্বশরীরে বাংলাদেশে উপস্থিত নেই এবং কাউকে হয়তো তিনি ছুয়ে দেখতে পারছেন না কিন্তু অনুভব করছেন সব ঘটনা সম্পর্কে। গত ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছে তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং যথাসাধ্য সাহায্য করার ব্যবস্থা নিয়েছেন। আহত নেতা কর্মীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।

    সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, অর্থনীতি ও জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে স্পষ্ট ও গঠনমূলক ভাষায় মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি জবাবদিহিমূলক সরকারই পারে বাংলাদেশের মানুষকে প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ দিতে। পুরো আলোচনায় তাঁর ভঙ্গি ছিল সংযত, ভাষা ছিল পরিষ্কার, আর যুক্তিগুলো ছিল প্রখর তীক্ষ্ণ বাস্তবতাভিত্তিক। কোন প্রশ্ন তিনি এগিয়ে যান নি বরং সাবলীল ভাষায় জবাব দিয়ে গেছেন। জনগণের ম্যান্ডেড নিয়ে সরকার পরিচালনা করতে হবে এর কোন বিকল্প নেই। তরুণ ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা তিনি ব্যক্ত করেছেন। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার রোড ম্যাপ ঘোষণা করেছেন। কেবল ভোট দানের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র চর্চা নয় সমাজে সর্বস্তরে বহু দলীয় গণতন্ত্র চর্চা করাই হবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

    অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন নতুন বিনিয়োগ ক্ষেত্র উদ্ভাবনের কথা বলেছেন। লুটপাট দুর্নীতি চাঁদাবাজি বন্ধ করার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। এবারের সাক্ষাৎকারে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সেই কার্ড পরিবারের মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এর মধ্য দিয়ে নারীকে ক্ষমতায়ন করার পরিকল্পনা সুস্পষ্ট হয়েছে। কৃষি কার্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন কৃষক তার উৎপাদনের ক্ষেত্রে যাতে ন্যায্য মূল্যে সার কীটনাশক এবং উন্নত বীজ পায় সেটা যেমন নিশ্চিত করা হবে একইভাবে তার ফসল ন্যায্য মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে। কৃষক হবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

    সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি। অপ্রীতিকর প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন খুবই স্বাচ্ছন্দে সাবলীল গতিতে। প্রশ্ন করা হয়েছে আপনার দলের নেতা কর্মীরা চাঁদাবাজি করছে জায়গা জমি দখল করছে এগুলোর ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? তিনি বলেছেন, গত ১৭ বছর ধরে আমার নেতা কর্মীরা ঘর ছাড়া বাড়িছাড়া। অনেক কষ্ট করে তারা প্রতিটা মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিয়েছে। তাদের এই অবদানের কথা আমি অস্বীকার করতে পারবো না। তারপরও আমার কাছে যখন যে মুহূর্তে চাঁদাবাজির কথা নকলবাজির কথা কানে এসেছে আমি সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা নিয়েছি। পরীক্ষিত কর্মীকেও পর্যন্ত আমি শাস্তি দিয়েছি দল থেকে বহিষ্কার করেছি। এরপরে তিনি আবার বলেছেন,”এমনও অনেক ঘটনা আছে দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যোগ সাজোষ করে আর এক ভাইয়ের জমি দখল করে রেখেছে। সে আমার দলের কর্মী। এখন ফ্যাসিবাদের দোসর ভাইটি এলাকায় ছাড়া। বিএনপি কর্মী তার হারানো সম্পদ বা জমি নিজের দখলে নিয়েছেন। এটা কে কি দখলবাজি বলা যাবে? পত্রপত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটাকে দখলবাজি বলে অনেক জায়গায় বিএনপির নেতা কর্মীদের ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করেছে।

    গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে ১৯৭৫ সালের প্রসঙ্গটি এনেছেন যখন সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার মাত্র চারটি প্রচারপত্র বাঁচিয়ে রেখেছিল। সেটাকে সংবাদপত্র বলা যায় না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। ২০০৮ সালের শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর সেই মত প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত করার প্রবণতা অব্যাহত থাকে। গত ১৭ বছর ধরে সংবাদপত্রের ওপর এমন কালা কানুন আরোপ করা হয়েছিল যে যখন তখন যাকে তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হতো। বিনা বিচারে আটক রেখে চালানো হতো নির্যাতন। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবারিত করে দেওয়া হবে। তারই স্পষ্ট ঘোষণা বিবিসির পাঠকদের উৎসাহিত করেছে।

    প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দলের সম্পর্ক কেমন হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট বলেছেন সীমান্তে আর ফেলানীর লাশ দেখতে চাই না। ভারত আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলা হবে ফারাক্কা বাধের ইস্যু। একজন স্বৈরাচার কে ভারত কীভাবে আশ্রয় দেয় সেটা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন অপরাধী যেই হোক না কেন তার বিচার হওয়া আইনের বিধান। অপরাধ করে কেউ বিচারের আওতার বাহিরে থাকবে এটা বিএনপি চায়না। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি অপরাধ করে থাকে তারও বিচার হওয়া উচিত।

    তারেক রহমান তার প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করেছেন কিন্তু সেখানেও ছিল মার্জিত রুচির পরিচয়।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে কেবল একজন দলের নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে থেকেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা অনেককে মুগ্ধ করেছে।

    গোটা সাক্ষাৎকার জুড়ে একটি মাত্র জায়গায় আবেগের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি বলেছেন যে ঘরে আমার মা বসবাস করতেন ,আমার ছোট ভাই বসবাস করত – আমি দেশে ফিরে হয়তো সেই ঘর ফিরে পাবো না। যে ঘরে আমার মাকে রেখে এসেছিলাম সেই মা এখন অসুস্থ। যে ভাইকে রেখে এসেছিলাম সে আর বেঁচে নেই।

    তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর থেকে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন—“এটাই একজন পরিণত নেতার ভাষা”, “তিনি শুধু রাজনীতিক নন, একজন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক।”

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়