১০/০৬/২০২৬, ১৮:১২ অপরাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    প্যারিসে মাটির নিচে ৬০ লাখ মানুষের নীরব নগরী

    জেড নিউজ ডেস্ক :

    বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় শহর প্যারিসের নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আইফেল টাওয়ার, শিল্পকলা, ফ্যাশন, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও রোমান্টিক পরিবেশের ছবি। কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল শহরের নিচে লুকিয়ে আছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ—অন্ধকার, নীরব ও ইতিহাসের ভারে ভারাক্রান্ত।

    মাটির প্রায় ২০ মিটার নিচে বিস্তৃত প্যারিসের ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধি পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ভূগর্ভস্থ অস্থিভাণ্ডারগুলোর একটি। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের অস্থি, যা একে বিশ্বের বৃহত্তম মানব-অস্থি সংগ্রহশালাগুলোর মধ্যে স্থান দিয়েছে।

    প্যারিসের ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধির ইতিহাস মূলত শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্কটের সাথে জড়িত। মধ্যযুগ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত শহরের অধিকাংশ লাশ কেন্দ্রস্থ কবরস্থানগুলোতে সমাহিত করা হতো। বিশেষ করে ‘লে ইনোসঁ’ বা ‘নির্দোষদের কবরস্থান’টি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হওয়ায় অতিরিক্ত ভরে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কবরস্থান-সংলগ্ন ভবনগুলোর বেসমেন্টে মানবদেহের অবশেষ ও দূষিত পদার্থ প্রবেশ করতে শুরু করে। দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

    ১৭৮০ সালে একটি দেয়াল ধসে পড়ে কবরস্থানের পচনশীল দেহাবশেষ পাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। সিদ্ধান্ত হয়, শহরের নিচে অবস্থিত পরিত্যক্ত চুনাপাথরের খনিগুলোকে অস্থি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হবে। ১৭৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লাশের অস্থি স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়। রাতের অন্ধকারে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গাড়িভর্তি অস্থি কবরস্থান থেকে এনে ভূগর্ভস্থ খনিগুলোতে রাখা হতো। এই প্রক্রিয়া কয়েক দশক ধরে চলতে থাকে।

    প্যারিসের নিচে থাকা চুনাপাথরের খনিগুলোর ইতিহাস আরো প্রাচীন। রোমান যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত এসব খনি থেকে পাথর উত্তোলন করে শহরের অসংখ্য ভবন, গির্জা ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে শহরের নিচে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বিশাল এক সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক। পরিত্যক্ত হওয়ার পর সেই সুড়ঙ্গগুলোই পরে ক্যাটাকম্বসে রূপান্তরিত হয়।

    বর্তমানে প্যারিসের ভূগর্ভে প্রায় ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এর খুব সামান্য অংশ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত পথের দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় কিলোমিটার। সেখানে পৌঁছাতে একটি সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে প্রায় ১৩০ ধাপ নিচে নামতে হয়। নিচে নামার পর দর্শনার্থীরা এমন এক পরিবেশে প্রবেশ করেন, যা একই সাথে বিস্ময়কর, ভীতিকর ও চিন্তার উদ্রেককারী।

    ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের অস্থির শিল্পসম্মত বিন্যাস। প্রথমদিকে অস্থিগুলো এলোমেলোভাবে সংরক্ষণ করা হলেও ঊনবিংশ শতকের শুরুতে এগুলোকে নতুনভাবে সাজানো হয়। খুলি ও দীর্ঘ হাড়গুলোকে নান্দনিক নকশায় স্তূপাকারে সাজিয়ে তৈরি করা হয় দেয়াল। ফলে এটি কেবল একটি অস্থিভাণ্ডার নয়, বরং এক ধরনের স্মৃতিসৌধে পরিণত হয়েছে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধিকে শুধু পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এটি প্যারিসের নগর ইতিহাস, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

     

     

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়