জেড নিউজ, ঢাকা:
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের বিষয়ে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তথ্য পাওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রধান কারণ হলো, যেসব দেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেসব দেশের অনেকের সঙ্গেই তথ্য আদান-প্রদানের কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই বাংলাদেশের।
এছাড়া পাচারকৃত অর্থ প্রায়ই বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে তৃতীয়, চতুর্থ, এমনকি পঞ্চম কোনো দেশে স্থানান্তর করা হয়। ফলে ওই অর্থ ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাও সমান জটিল, কারণ তাদের বেশিরভাগই ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
বেশ কয়েকটি ব্যাংক যদিও ফরেনসিক অডিট সম্পন্ন করে অর্থ পাচারের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করেছে, তবু তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণে এখন একটি দ্বিমুখী কৌশলের প্রয়োজন: একাধারে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া।
যেহেতু এসব লেনদেনের বেশিরভাগই মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়েছে, তাই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সব ধরনের অর্থ স্থানান্তরের বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অ্যাকাউন্টের মধ্যে ডলারের লেনদেন হলে, তা যতগুলো দেশের মাধ্যমেই হোক না কেন, মার্কিন ট্রেজারি সেই রেকর্ড সংরক্ষণ করে।
এখানে মূল বিষয় হলো, মার্কিন ট্রেজারি সহযোগিতা করতে কতটা ইচ্ছুক—সেটি আবার নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। মার্কিন প্রশাসন যদি আন্তরিক হয়, তবে এই তথ্য পাওয়া খুবই সম্ভব। তাই উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো জরুরি।
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজে সফল হতে হলে কেবল যে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়েছে, সেই দেশের সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়—বরং যেসব দেশে অর্থ গেছে এবং যেসব দেশের মাধ্যমে গেছে, সেসব দেশের সরকারেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশের কাছে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিছু দেশ এতে আগ্রহ দেখালেও অন্য দেশগুলো সাড়া দেয়নি। কোনো কোনো দেশ আবার প্রস্তাবগুলো ফেরত পাঠিয়ে তাদের নিজস্ব অফিশিয়াল ভাষায় তা তৈরি করার অনুরোধ জানিয়েছে। এই প্রতিবন্ধকতা মূলত বাংলাদেশের যথাযথ দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাবের প্রতিফলন।
বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ল ফার্ম বাংলাদেশকে আইনি সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ পাচারের অভিযোগের সপক্ষে জোরালো প্রমাণ চায়। দুর্বল কোনো মামলায় তারা নিজেদের সম্পদ ও শ্রম বিনিয়োগ করতে রাজি নয়।
বর্তমানে একটি বিশেষায়িত টাস্কফোর্স পলাতকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার জন্য কাজ করছে। কিছু মামলা শুরু হলেও এই পলাতকদের গ্রেপ্তার করার প্রক্রিয়াটি জটিল। অপরাধীদের ধরার পর সেই অর্থ উদ্ধার করতে হলে সংশ্লিষ্ট সম্পদের প্রকৃত মালিকানা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা প্রয়োজন।
অভিযুক্তদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার অনুরোধ জানিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য, আইল অভ ম্যান ও সাইপ্রাসের কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদসহ বেশ কিছু সম্পদ ফ্রিজ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক সাবেক এই মন্ত্রীর ফ্রিজ হওয়া সম্পদ থেকে তাদের পাওনা দাবি করে যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে।
তবে এ ধরনের আর্থিক নিষ্পত্তি মোটেও সহজ নয়; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ কেবল আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে উদ্ধার করা সম্ভব নয়; এই জটিলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।





