জেড নিউজ, ঢাকা:
বর্ষা এলেই যেন এক অদৃশ্য আতঙ্ক ঘিরে ধরে নগরজীবনকে। টানা বৃষ্টি, জমে থাকা পানি আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ-সব মিলিয়ে বেড়ে যায় এডিস মশার বিস্তারের ঝুঁকি। আর সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন, অনেকেই গুরুতর জটিলতায় ভোগেন, কেউ কেউ প্রাণও হারান।
তবে আশার কথা হলো, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবসময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। বরং প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সময় দিলেই বাড়ি, কর্মস্থল কিংবা আশপাশের পরিবেশকে অনেকটাই নিরাপদ রাখা সম্ভব। কারণ এডিস মশা সাধারণত মানুষের বাড়ির ভেতর বা আশপাশেই জন্মায়। তাই সচেতনতা ও নিয়মিত পরিচর্যাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
কেন মাত্র ১০ মিনিটই যথেষ্ট?
এডিস মশা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। একটি ছোট ফুলের টব, পুরোনো কাপ, ভাঙা বালতি, এসির ট্রে কিংবা ফ্রিজের নিচের পানির ট্রেতেও এই মশার বংশবিস্তার হতে পারে। এসব স্থান প্রতিদিন বা অন্তত নিয়মিত পরীক্ষা করলে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশার জন্মস্থান ধ্বংস করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আর এজন্য প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিটের সচেতন অভ্যাসই যথেষ্ট।
জমে থাকা পানি খুঁজে ফেলুন
বাসার বারান্দা, ছাদ, বাথরুম, রান্নাঘরের পেছনের অংশ কিংবা উঠানে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা দেখে নিন। ছোট পাত্রেও পানি থাকলে তা ফেলে দিন।
ফুলের টব পরিষ্কার করুন
অনেকে গাছের টবে দিনের পর দিন পানি জমিয়ে রাখেন। সপ্তাহে অন্তত একবার টব ধুয়ে ফেলুন এবং প্রয়োজন হলে পানি পরিবর্তন করুন।
ফ্রিজ ও এসির ট্রে পরীক্ষা করুন
ফ্রিজের নিচের পানির ট্রে কিংবা এসির ড্রেন ট্রেতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে সেটিও এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে।
ডাস্টবিন ও পুরোনো পাত্র উল্টে রাখুন
ফেলে রাখা বোতল, টিনের কৌটা, নারকেলের খোসা, প্লাস্টিকের কাপ বা টায়ারে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। ব্যবহার না করলে এগুলো উল্টে রাখুন বা সরিয়ে ফেলুন।
পানির ট্যাংক ভালোভাবে ঢেকে রাখুন
যেসব পাত্রে দীর্ঘদিন পানি সংরক্ষণ করা হয়, সেগুলো অবশ্যই শক্তভাবে ঢেকে রাখুন।
শুধু নিজের বাড়ি নয়, আশপাশও পরিষ্কার রাখুন
একটি বাড়ি পরিষ্কার থাকলেও পাশের বাড়িতে যদি পানি জমে থাকে, তাহলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই প্রতিবেশীদেরও সচেতন করুন। প্রয়োজনে সবাই মিলে সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে পারেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধ একটি সামাজিক দায়িত্ব। একজনের অসচেতনতা পুরো এলাকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
জ্বর হলে অবহেলা নয়
হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমিভাব, দুর্বলতা বা শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিছু ব্যথানাশক ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার গ্রহণ এবং সময়মতো চিকিৎসা ডেঙ্গু মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
শিশুরা অনেক সময় নিজের অসুস্থতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না। তাই জ্বরের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, খাওয়ায় অনীহা, অস্বাভাবিক কান্না বা নিস্তেজ হয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
ছোট অভ্যাস, বড় সুরক্ষা
আমরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, টেলিভিশনের সামনে বা মোবাইল ফোনে অনেক বেশি সময় কাটাই। সেই সময়ের মাত্র ১০ মিনিট যদি নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে ব্যয় করি, তাহলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের লড়াই শুরু হয় নিজের ঘর থেকেই। প্রতিদিন কয়েক মিনিটের সচেতনতা শুধু আপনাকে নয়, আপনার পরিবার, প্রতিবেশী এবং পুরো সমাজকে নিরাপদ রাখতে পারে।
বর্ষাকালে তাই একটি ছোট অভ্যাস গড়ে তুলুন-প্রতিদিন ১০ মিনিট সময় নিয়ে বাড়ির প্রতিটি কোণা দেখে নিন, কোথাও পানি জমে আছে কি না। এই সামান্য উদ্যোগই হয়তো একটি পরিবারকে ডেঙ্গুর কষ্ট থেকে রক্ষা করবে, এমনকি বাঁচাতে পারে একটি মূল্যবান জীবন।




