০২/০৭/২০২৬, ১৩:৩৩ অপরাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    কঙ্গোর স্বপ্নভঙ্গ, কেইন ঝড়ে শেষ হাসি ইংল্যান্ডের

    জেড নিউজ স্পোর্টস:

    একটি গোলে মুহূর্তেই হাজারো কণ্ঠ স্তব্ধ, আবার একটি গোলেই নিভু নিভু বিশ্বাসে নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠা। আটলান্টার রাতটাও ছিল ঠিক তেমনই। ফুটবল তার সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসল আরেকবার। শুরুতে ব্রায়ান কিপেঙ্গার বজ্রগতির শটে ডিআর কঙ্গোর স্বপ্ন দেখা শুরু, ইংল্যান্ডের গ্যালারিতে তখন অস্বস্তির নীরবতা। মনে হচ্ছিল, আরেকটি অঘটনের গল্পই লেখা হচ্ছে গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থে। কিন্তু বড় দলগুলো বিপর্যয় থেকে ফিরে আসার গল্পে মহাকাব্যিক চরিত্র। ব্যতিক্রম হলো না এবারও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছন্দের ঝংকার তোলে থ্রি লায়ন্স, নায়ক হয়ে ওঠেন ‘নাম্বার নাইন’ হ্যারি কেইন। তার জোড়া গোলে স্বপ্ন ধূসর হয়ে যায় ডিআর কঙ্গোর, ২-১ ব্যবধানে অবিস্মরণীয় জয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে টমাস টুখেলের দল।

    ম্যাচের শুরুতেই বোঝা গিয়েছিল, ডিআর কঙ্গো শুধু অংশ নিতে মাঠে নামেনি, ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়েই খেলতে এসেছে। সাহসী প্রেসিং, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ আর উইং ব্যবহার করে শুরু থেকেই ইংল্যান্ডকে চাপে রাখে আফ্রিকার দলটি। সেই সাহসের পুরস্কারও পেয়ে যায় মাত্র সপ্তম মিনিটে। মাঝমাঠ থেকে ভেসে আসা লম্বা পাসে ইংল্যান্ডের রক্ষণে তৈরি হয় সামান্য ফাঁক। সেই সুযোগই লুফে নেন ব্রায়ান কিপেঙ্গা। ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিকট পোস্ট লক্ষ্য করে নেওয়া তার জোরালো শট জর্ডান পিকফোর্ডের হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়। মুহূর্তেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ডিআর কঙ্গো।

    অপ্রত্যাশিত এই ধাক্কায় কিছুটা ছন্দ হারিয়ে ফেলে ইংল্যান্ড। মাঝমাঠে ডেকলান রাইস ও জুড বেলিংহ্যাম বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও আক্রমণের শেষভাগে ছিল অস্থিরতা। অন্যদিকে কঙ্গো রক্ষণ ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ, আর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি যেন একাই গড়ে তুলেছিলেন অদৃশ্য প্রাচীর।

    ৩০তম মিনিটে রাইসের ক্রস থেকে বেলিংহ্যামের শক্তিশালী হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন এমপাসি। পাঁচ মিনিট পর রাশফোর্ডের নিচু ক্রস থেকে গোলপোস্টের সামনে হ্যারি কেইন ও বেলিংহ্যাম অপেক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত বল বিপদমুক্ত করেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা। গোললাইন থেকে তার সেই ক্লিয়ারেন্স ডিআর কঙ্গোর লিড অক্ষুণ্ণ রাখে।

    প্রথমার্ধের শেষদিকে বিতর্কও ছড়ায়। ৪৩ মিনিটে বক্সের ভেতরে গোলরক্ষকের সংস্পর্শে পড়ে যান হ্যারি কেইন। ইংলিশ ফুটবলাররা পেনাল্টির জোর দাবি তুললেও রেফারি সেটিকে ডাইভ হিসেবে দেখেন। রিপ্লেতে বিতর্কের যথেষ্ট অবকাশ থাকলেও ভিএআর মাঠের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। যোগ করা সময়ে বেলিংহ্যামের হেড এবং কর্নার থেকে কেইনের ভলি—দুটিই অবিশ্বাস্য সেভে আটকে দেন এমপাসি। ফলে ১-০ গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় ডিআর কঙ্গো।

    বিরতির পর দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। টুখেলের নির্দেশে ইংল্যান্ড আক্রমণের গতি বাড়ায়। ৪৯ মিনিটে রাইসের কর্নার থেকে আবারও সুযোগ পান বেলিংহ্যাম, কিন্তু কঙ্গোর রক্ষণ শেষ মুহূর্তে বিপদ সামলে নেয়। ৫১ মিনিটে রাশফোর্ডের শট সাইডনেটে লাগে, এরপর বেলিংহ্যামের আরেকটি প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন এমপাসি। তখনও মনে হচ্ছিল, ভাগ্য যেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই দাঁড়িয়ে আছে।

    এক ঘণ্টা পার হতেই আক্রমণে নতুন প্রাণ ফেরাতে একসঙ্গে পরিবর্তন আনেন টুখেল। নোনি মাদুয়েকে ও রাশফোর্ডের পরিবর্তে মাঠে নামেন বুকায়ো সাকা ও অ্যান্থনি গর্ডন। কিছুক্ষণ পর যোগ দেন এবেরেচি এজেও। বদলগুলো যেন ইংল্যান্ডের আক্রমণে নতুন ছন্দ এনে দেয়। ডিআর কঙ্গোর রক্ষণভাগ ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে থাকে।

    অবশেষে ৭৪তম মিনিটে আসে বহু প্রতীক্ষিত সমতা। ডেকলান রাইস ডান প্রান্তে দারুণ একটি বল বাড়িয়ে দেন গর্ডনের দিকে। গর্ডনের নিখুঁত ক্রস বক্সে উড়ে আসতেই হেডে জালে জড়ান অধিনায়ক হ্যারি কেইন। গোলের সঙ্গে সঙ্গে যেন বদলে যায় ম্যাচের আবহ। যে দলটি কিছুক্ষণ আগেও হতাশ ছিল, তারাই জয়ের সুবাস পেতে শুরু করে।

    সমতায় ফেরার পর আর থামেনি ইংল্যান্ড। সাকা, বেলিংহ্যাম ও এজের সমন্বিত আক্রমণে ডিআর কঙ্গো রক্ষণে বাড়তে থাকে চাপ। ৮৬তম মিনিটে সেই চাপেরই ফল আসে। বেলিংহ্যামের শট প্রথমে ফিরিয়ে দেন এমপাসি। কিন্তু ফিরতি বল বক্সের বাইরে পেয়ে ডান দিকে এক পা সরিয়ে অসাধারণ শটে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণায়। গোলরক্ষকের কোনো সুযোগই ছিল না। কেইনের জাদুতে ইংল্যান্ড এগিয়ে যায় ২-১ ব্যবধানে। তার এই গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো ম্যাচের গল্প।

    শেষ কয়েক মিনিটে মরিয়া হয়ে সমতা ফেরানোর চেষ্টা চালায় ডিআর কঙ্গো। উইসা, কায়েম্বে ও এলিয়াদের আক্রমণে কিছুটা চাপে পড়লেও ইংল্যান্ডের রক্ষণ আর ভুল করেনি। যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে উইসার ফ্রি-কিক অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ইংল্যান্ড শিবির। কিছুক্ষণ পরই শেষ বাঁশি বাজান রেফারি।

    রুদ্ধশ্বাস এই প্রত্যাবর্তনের জয়ে থ্রি লায়ন্স এখন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ সহ-আয়োজক মেক্সিকো। আর চোখে জল নিয়েই বিশ্বমঞ্চকে বিদায় জানাতে হলো লড়াকু ডিআর কঙ্গোকে, যারা হারলেও নিজেদের সাহস, শৃঙ্খলা আর লড়াইয়ের মানসিকতা জানিয়ে গেলো ছোট দলের রূপকথা কেবলই রূপকথা নয়; আগামীর প্রত্যাশাও।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়