জেড নিউজ, ঢাকা:
প্রত্যেক বন্ধুমহলেই এমন একজন থাকেন, যার কাছে অন্যরা একটু বেশি স্বাচ্ছন্দবাধ করেন। মন খারাপ হলে তার কাছেই ফোন করেন। সম্পর্কের সমস্যা হলে তার কাছেই পরামর্শ, আবার অফিসে বসের সঙ্গে ঝামেলা হলেও তার কাছেই ছুটে আসেন বন্ধুরা। তিনি মন দিয়ে শোনেন, পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন এবং প্রয়োজনের সময় শান্তভাবে নিজের মতামত দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষায় এমন বন্ধুকেই অনেক সময় বলা হচ্ছে ‘থেরাপিস্ট ফ্রেন্ড’।
তবে নামের মধ্যে ‘থেরাপিস্ট’ থাকলেও তিনি পেশাদার থেরাপিস্ট নন। বরং এটি এমন একজন বন্ধুকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যিনি বন্ধুদের আবেগের কথা মন দিয়ে শোনেন এবং মানসিকভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করেন। আপনার মধ্যেও এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে কি না, মিলিয়ে দেখতে পারেন।
সবাই আপনার কাছেই মনের কথা বলে
কোনো বন্ধু মন খারাপ করলে হয়তো প্রথমেই আপনাকে ফোন করে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক সমস্যা, পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্রের চাপ, ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও আপনার সঙ্গে সহজে ভাগ করে নেয়। কারণ আপনি সাধারণত মাঝপথে কথা থামিয়ে নিজের গল্প শুরু করেন না। বরং আগে পুরো বিষয়টি শোনেন, তারপর নিজের মতামত জানান। মানুষের কথা মন দিয়ে শোনার এই অভ্যাসই আপনাকে বন্ধুদের কাছে নিরাপদ একজন মানুষ হিসেবে তৈরি করতে পারে।
অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন
আপনি হয়তো বন্ধুর সমস্যাকে ছোট করে দেখেন না। কেউ কোনো বিষয়ে কষ্ট পেলে ‘এটা নিয়ে এত ভাবছ কেন?’ বলার বদলে বোঝার চেষ্টা করেন, ঠিক কোন জায়গাটা তাকে কষ্ট দিচ্ছে। তবে এর একটা নেতিবাচক দিকও থাকতে পারে। অন্যকে ভালো রাখতে গিয়ে আপনি যদি নিয়মিত নিজের অনুভূতিকে উপেক্ষা করতে শুরু করেন, তাহলে একসময় মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন।
সিদ্ধান্তের আগে সবাই আপনার মতামত চায়
বন্ধুমহলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যদি সবাই আপনার কাছে আসে, সেটিও ‘থেরাপিস্ট ফ্রেন্ড’ হওয়ার একটি লক্ষণ হতে পারে। আপনি হয়তো আবেগের মুহূর্তে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টির ভালো-মন্দ দুই দিকই দেখার চেষ্টা করেন।
তবে মনে রাখতে হবে, পরামর্শ দেওয়া আর অন্যের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। বন্ধুর জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তার নিজেরই হওয়া উচিত।
‘না’ বলতে আপনার কষ্ট হয়
আপনি ব্যস্ত, ক্লান্ত কিংবা নিজের জন্য সময় প্রয়োজন-তারপরও বন্ধু ফোন করলে কথা বলতে বসে যান? কাউকে হতাশ করতে চান না বলেই হয়তো প্রায় সব অনুরোধে সাড়া দেন।
এমন অভ্যাস ধীরে ধীরে আপনাকে মানসিকভাবে চাপে ফেলতে পারে। সব সময় সবার জন্য উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে ‘এখন কথা বলার মতো অবস্থায় নেই, পরে কথা বলি’-এটুকু বলাও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
অন্যের সমস্যা নিজের সমস্যা হয়ে যায়
শুধু বন্ধুর কথা শোনা নয়, তার সমস্যার সমাধান করাও যদি নিজের দায়িত্ব বলে মনে হয়, তাহলে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। বন্ধুর মন খারাপ দেখে আপনারও সারাদিন খারাপ যাচ্ছে, তার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনি অতিরিক্ত চিন্তা করছেন কিংবা সমস্যা মেটানোর জন্য নিজেই সবকিছু করতে চাইছেন-এগুলো মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
সহানুভূতিশীল হওয়া ভালো, কিন্তু অন্যের জীবনের প্রতিটি সমস্যার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া প্রয়োজন নেই।
নিজের সমস্যার কথা বলতে পারেন না
‘থেরাপিস্ট ফ্রেন্ড’দের একটি মজার কিন্তু কষ্টের অভিজ্ঞতা হলো- তারা সবাইকে শুনলেও নিজেদের কথা বলার মানুষ খুঁজে পান না। বন্ধুরা অভ্যাসবশত আপনাকে পরামর্শদাতা হিসেবেই দেখে। ফলে আপনার নিজের মন খারাপ, ভয়, হতাশা কিংবা অনিশ্চয়তার কথাগুলো অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
কিন্তু শক্ত থাকার অর্থ সব সময় একা সবকিছু সামলে নেওয়া নয়। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত কারও কাছে নিজের কথাও বলা জরুরি।
বন্ধুত্বে সীমারেখাও জরুরি
বন্ধুর পাশে থাকা নিঃসন্দেহে সুন্দর একটি গুণ। কাউকে বিচার না করে তার কথা শোনা, প্রয়োজনের সময় সাহস দেওয়া এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানো বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে। কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের মানসিক শান্তি বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
দিন শেষে একা লাগে, যান্ত্রিক ব্যস্ততায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন না তো?
আপনি কারো বন্ধু, তার ব্যক্তিগত জীবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন। তাই কখন শুনবেন, কখন পরামর্শ দেবেন আর কখন নিজের জন্য সময় নেবেন-সেই সীমারেখা তৈরি করা জরুরি।
তাই নিজের যত্ন নেওয়া স্বার্থপরতা নয়। বরং নিজের মানসিক শক্তি ও ব্যক্তিগত পরিসর ঠিক রাখতে পারলেই অন্যের পাশে আরও সুস্থভাবে দাঁড়ানো সম্ভব। তাই বন্ধুমহলের ‘থেরাপিস্ট ফ্রেন্ড’ হলেও নিজের মনকেও মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করুন-‘আমি কেমন আছি?





