spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

৩৬ জুলাই বিপ্লব: জনআকাঙ্ক্ষা বনাম গোষ্ঠীস্বার্থ

লেখক: ড. মো. শরিফুল ইসলাম দুলু

ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। ৩৬ জুলাই সেই ধরনের একটি ঐতিহাসিক প্রতীকী মুহূর্ত, যা বাংলাদেশের মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বপ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের মতোই, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এই পরিবর্তনের প্রকৃত মালিক কে? জনগণ, নাকি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী?

গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ব্যাপকতা। একটি প্রকৃত আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন বা মতাদর্শের সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে যুক্ত হয়। তাই কোনো গণঅভ্যুত্থানের অর্জনকে এককভাবে কোনো পক্ষের সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সেটি আন্দোলনের মূল চেতনাকেই সংকুচিত করে।

৩৬ জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং নাগরিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। মানুষ চেয়েছে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতা জনগণের সেবার মাধ্যম হবে, ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হবে না। যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।তবে বড় পরিবর্তনের পর একটি স্বাভাবিক ঝুঁকি তৈরি হয়। কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী কখনো কখনো আন্দোলনের জনপ্রিয়তা ও আবেগকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তখন জনআকাঙ্ক্ষা ও গোষ্ঠীস্বার্থের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়।

জনআকাঙ্ক্ষা চায় ঐক্য, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তি। আর গোষ্ঠীস্বার্থ চায় নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব এবং একচ্ছত্র অবস্থান। এই পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
কোনো আন্দোলনের চেতনা রক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সেই আন্দোলনের নামে নতুন কোনো বৈষম্য, নতুন কোনো আধিপত্য বা নতুন কোনো ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে কি না। কারণ জনগণ পুরোনো অন্যায়ের পরিবর্তে নতুন অন্যায় গ্রহণ করতে আন্দোলনে অংশ নেয় না।

তাই ৩৬ জুলাইয়ের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন এর মাধ্যমে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবে।

গণতন্ত্রে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জনগণের ওপর নিজেদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব চাপিয়ে দিতে পারে না। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে, ইতিহাসের মালিকানা দাবি করে নয়।
একটি আন্দোলনের

সবচেয়ে বড় সম্মান হলো, সেটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ইতিবাচক রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ভিত্তিতে পরিণত করা। আর সবচেয়ে বড় অপমান হলো, সেই আন্দোলনের আবেগকে ব্যবহার করে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করা।

৩৬ জুলাইয়ের চেতনা তাই কোনো গোষ্ঠীর নয়, এটি জনগণের। এই চেতনাকে রক্ষা করার দায়িত্বও জনগণের, রাষ্ট্রের এবং সকল গণতান্ত্রিক শক্তির।শেষ পর্যন্ত ইতিহাস একটি প্রশ্নই করবে—এই পরিবর্তন কি জনগণের ক্ষমতায়ন ঘটিয়েছিল, নাকি কেবল ক্ষমতার নতুন বণ্টন তৈরি করেছিল?উত্তর নির্ভর করবে আমরা জনআকাঙ্ক্ষাকে কতটা প্রাধান্য দিই এবং গোষ্ঠীস্বার্থকে কতটা প্রত্যাখ্যান করি তার ওপর।

ড. মো. শরিফুল ইসলাম দুলু
বিজনেস স্ট্র‍্যাটেজিস্ট ও বাজার অর্থনীতিবিদ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়