জেড নিউজ, ডেস্ক :
প্রকৃত আলেমদের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যার মাধ্যমে তাঁদের অন্যদের থেকে পৃথক করা যায়। শুধু প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতে পারা বা মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারা আলেম হওয়ার মানদণ্ড নয়; কিংবা ছাত্র, শ্রোতা বা ভক্তের সংখ্যা বেশি হওয়া প্রকৃত আলেম হওয়ার প্রমাণ নয়।
যেভাবে প্রকৃত আলেম চিনবেন
১. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের পথে অবিচল থাকা : প্রকৃত আলেমকে চেনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অনুসারী। তিনি ইলম অর্জনে আন্তরিক ও পরিশ্রমী হবেন। তাঁর জ্ঞান শুধু তথ্যের সমষ্টি হবে না; বরং তাঁর জ্ঞান আকিদা, আমল, চরিত্র ও জীবনযাপনে প্রতিফলিত হবে।
২. সম্মান ও সম্পদের মোহমুক্ত হওয়া : প্রকৃত আলেম তাঁর ইলমকে দুনিয়াবি মর্যাদা অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবেন না।
তিনি জ্ঞানের বিনিময়ে কারো কাছে সম্মান প্রত্যাশা করবেন না। মানুষের প্রশংসা বা দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য ইলমকে ব্যবহার করবেন না। আল-আজুররি (রহ.) বলেন, ‘প্রকৃত আলেম তাঁর ইলমের মাধ্যমে রাজা-বাদশাহদের কাছে মর্যাদা অর্জন করতে চাইবেন না এবং তাদের কাছে নিজেকে নিয়ে যাবেন না। তিনি ইলমের বিনিময়ে মূল্য গ্রহণ করবেন না এবং এর মাধ্যমে নিজের দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবেন না।
’ [আবু বকর মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন আল-আজুররি, আখলাকুল উলামা (আলেমদের চরিত্র), পৃ. ৩৫]
৩. ইলমের সঙ্গে আমল ও আল্লাহভীতি থাকা : প্রকৃত আলেম শুধু জ্ঞানী হন না; তিনি আল্লাহভীরু ও ইবাদত গুজারও হন। তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয়, বিনয় ও আনুগত্য থাকবে। কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু আলেমরাই তাঁকে (আল্লাহকে) যথাযথভাবে ভয় করে।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ২৮)
অতএব, যে ইলম আল্লাহভীতি বাড়ায় না, সেই ইলম তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে না। প্রকৃত ইলম মানুষের হৃদয়কে আল্লাহর সামনে নত করে।
৪. খ্যাতি ও প্রশংসা থেকে দূরে থাকা : প্রকৃত আলেম সাধারণত মানুষের খ্যাতি ও প্রশংসার প্রতি লোভী হন না; বরং মানুষ যখন তাঁকে অতিরিক্ত প্রশংসা করে কিংবা তাঁর নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তিনি নিজের জন্য ভয় করেন—এটি যেন তাঁর জন্য পরীক্ষা বা ধ্বংসের কারণ না হয়ে যায়। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল (রহ.) তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়া ও খ্যাতি অর্জনের ব্যাপারে নিজের জন্য ভয় করতেন। পূর্বসূরি মুসলিম মনীষীরা অতিরিক্ত খ্যাতি ও মানুষের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার আকাঙ্ক্ষা থেকে সতর্ক করতেন। [ইবনু রজব আল-হাম্বলি, ফাদলু ইলমিস সালাফ আলা ইলমিল খালাফ, পৃ. ১০৮]
ইবরাহিম ইবনু আদহাম (রহ.) বলতেন, ‘যে ব্যক্তি খ্যাতি ভালোবাসে, সে আল্লাহর সঙ্গে সত্যনিষ্ঠ নয়।’ (আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু ইবরাহিম আল-বুখারি, আত-তারিখুল কাবির, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৩৬৩)
অবশ্য মানুষের ভালোবাসা বা সম্মান নিজে কোনো অপরাধ নয়; কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করার প্রবণতা, খ্যাতি অর্জনকে নিজের লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা এবং হাল আমলের ‘ভিউ ব্যবসা’ একজন আলেমের জন্য বিপজ্জনক।
৫. বিজ্ঞ আলেমদের স্বীকৃতি থাকা : প্রকৃত আলেমকে চেনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো যোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত আলেমদের সাক্ষ্য ও স্বীকৃতি। ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন, তিনি ফতোয়া দেওয়ার কাজে বসেননি, যতক্ষণ না ৭০ জন আলেম সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি এ কাজের যোগ্য।
এ থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত আলেম হওয়া শুধু নিজের দাবি বা নিজের জনপ্রিয়তার বিষয় নয়। ইলমের ক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বীকৃতি আসে ইলমের অধিকারীদের কাছ থেকেই।
৬. আলোচনা ও লেখালেখি পর্যালোচনা করা : কোনো ব্যক্তির ইলম যাচাই করার আরেকটি উপায় হলো তাঁর ফতোয়া, গ্রন্থ, প্রবন্ধ, পাঠদান ও বক্তৃতা পর্যালোচনা করা। ইমাম জাহাবি (রহ.) তাঁর ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ গ্রন্থে হাফেজ আবু তাহির আস-সিলাফির একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি আবু সুলাইমান আল-খাত্তাবি (রহ.) সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিরপেক্ষভাবে তাঁর রচনাগুলো পর্যালোচনা করবে এবং তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য ও জ্ঞানের গভীরতা দেখবে, সে তাঁর ইমামত, দ্বিনদারি ও আমানতদারি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে।’
অতএব, শুধু কোনো বক্তার জনপ্রিয়তা দেখে তাঁর ইলমের মান নির্ধারণ করা উচিত নয়।
৭. ‘আলেম’ উপাধি ব্যবহারে সতর্কতা : একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি—‘আলেম’ উপাধি এমন ব্যক্তিকেই দেওয়া উচিত, যিনি সত্যিকার অর্থে এর যোগ্য। যাঁরা এখনো ইলমের প্রাথমিক পর্যায়ে আছেন, তাঁদের এমন মর্যাদাপূর্ণ উপাধি দেওয়া হলে নানা ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে প্রকৃত আলেমদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।




