spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

অন্যের প্রতি সুধারণাই মুমিনের সৌন্দর্য

জেড নিউজ, ডেস্ক :

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তিগুলোর একটি হলো বিশ্বাস। পরিবার, সমাজ কিংবা কর্মক্ষেত্র—সব জায়গাতেই সম্পর্ক টিকে থাকে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সুধারণার ওপর।

বিপরীতে অমূলক সন্দেহ মানুষের অন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করে, সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায় এবং একসময় ভালোবাসার জায়গায় অবিশ্বাস ও বিরোধ জন্ম দিতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না।

’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

এই একটি আয়াতেই সন্দেহের পরিণতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে—অমূলক ধারণা থেকে গোপন অনুসন্ধান, আর সেখান থেকে গিবত ও সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয়। কেননা মানুষের মনে যখন কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অমূলক সন্দেহের জন্ম নেয়, তখন তা অনেক সময় সেখানেই থেমে থাকে না। সন্দেহ ধীরে ধীরে অনুসন্ধিৎসা, গোপন বিষয় খোঁজা, পরচর্চা, অপবাদ এমনকি অন্যায়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

তাই কোনো মানুষের ব্যাপারে শুধু অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন মুমিনের জন্য নিরাপদ পথ নয়।

কোনো কথা শুনলে কিংবা কোনো আচরণ দেখে সঙ্গে সঙ্গে নেতিবাচক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর পরিবর্তে বিষয়টি যাচাই করা এবং সম্ভব হলে ভালো অর্থ গ্রহণ করা ইসলামের শিক্ষা।

সন্দেহ শয়তানের একটি হাতিয়ার

শয়তান মানুষের অন্তরে সন্দেহের বীজ বপন করে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মী—যে সম্পর্কই হোক, অবিশ্বাস তৈরি হলে সেখানে শান্তি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

একটি ছোট ঘটনা নিয়ে মানুষ মনে মনে নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে—‘সে হয়তো আমাকে অপমান করতে চেয়েছে’, ‘সে নিশ্চয়ই আমার ক্ষতি করতে চায়’, ‘আমার ব্যাপারে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু বলেছে।’ অথচ বাস্তবতা হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এভাবেই অমূলক ধারণা মানুষের মনে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। অথচ যার বিরুদ্ধে সন্দেহ করা হচ্ছে, সে হয়তো এসবের কিছুই জানে না।

তবে সুধারণা পোষণ করার অর্থ এই নয় যে, মানুষ প্রতিটি পরিস্থিতিতে বাস্তবতা উপেক্ষা করবে কিংবা প্রতারণা ও অন্যায়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে না। ইসলাম যেমন অমূলক সন্দেহ থেকে নিষেধ করেছে, তেমনি সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বও দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যাচাই করে নাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

তাই প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী মনে না করা, আবার বাস্তব প্রমাণ উপস্থিত হলে সত্যতা যাচাই করে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

একজন মুমিনের নিজের আচরণও এমন হওয়া উচিত নয়, যা অন্যের মনে অমূলক সন্দেহের জন্ম দেয়। কখনো একজন ব্যক্তি ভালো উদ্দেশ্যেই কোনো কাজ করেন, কিন্তু তাঁর আচরণ এমন অস্পষ্ট হয় যে অন্যরা ভুল ধারণা করে বসে। এ ক্ষেত্রে সামান্য ব্যাখ্যাই অনেক ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে—এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। একবার রাতে তিনি তাঁর স্ত্রী সফিয়্যা (রা.)-কে নিয়ে যাচ্ছিলেন। দুই সাহাবি তাঁকে দেখে দ্রুত চলে যেতে চাইলে নবী (সা.) তাঁদের বললেন, ‘ধীরে চলো, তিনি সফিয়্যা বিনতে হুয়াই।’ তাঁরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আপনার ব্যাপারে সন্দেহ করব?’ তিনি বললেন, ‘শয়তান মানুষের মধ্যে রক্তের মতো প্রবাহিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের মনে ভুল ধারণার সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়া উত্তম।

সুধারণা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে

পরস্পরের প্রতি ভালো ধারণা সমাজে আস্থা তৈরি করে। একজন স্বামী স্ত্রীর ব্যাপারে সুধারণা রাখলে সংসারে শান্তি বাড়ে। ভাই ভাইয়ের প্রতি আস্থা রাখলে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর ব্যাপারে ভালো ধারণা রাখলে সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের প্রতি আস্থা থাকলে সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, সন্দেহ মানুষের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে। কথা কমে যায়, যোগাযোগ নষ্ট হয়, ছোট ঘটনাও বড় বিরোধে রূপ নেয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা অনুমান বা কুধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ অনুমানই সবচেয়ে মিথ্যা কথা।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

সুধারণা একটি ঈমানি দায়িত্ব

সুধারণাকে শুধু সামাজিক সৌজন্য মনে করলে বিষয়টির গুরুত্ব কমে যায়। একজন মুমিনের অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ, কুধারণা ও অমূলক অবিশ্বাস থেকে পরিচ্ছন্ন রাখাও ইসলামী চরিত্রের অংশ। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী—সবার ক্ষেত্রেই অকারণে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি, নিরাপত্তা ও ঐক্যের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

অন্তরকে সন্দেহমুক্ত রাখাই মুমিনের সৌন্দর্য

মানুষের চোখ অনেক কিছু দেখে, কিন্তু সবকিছুর বাস্তবতা জানে না। মানুষের কান অনেক কথা শোনে, কিন্তু সব কথা সত্য নয়। তাই একজন মুমিনের উচিত কোনো কথা শুনেই সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো এবং কোনো দৃশ্য দেখেই নেতিবাচক ব্যাখ্যা না দাঁড় করানো। কেউ ভুল করলে তাকে নসিহত করা যায়, অপরাধ করলে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়; কিন্তু প্রমাণ ছাড়া মানুষের সম্মান নষ্ট করা, গোপনীয়তা অনুসন্ধান করা কিংবা তার বিরুদ্ধে কুধারণা পোষণ করা একজন মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।

সুধারণা মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে, সম্পর্ককে মজবুত করে এবং সমাজে আস্থা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। আর অমূলক সন্দেহ মানুষকে এমন এক পথে নিয়ে যেতে পারে, যার শুরু হয় কল্পনা দিয়ে, কিন্তু শেষ হতে পারে গিবত, অপবাদ, শত্রুতা ও অন্যায়ের মধ্যে।

তাই মুমিনের উচিত—শুনে যাচাই করা, দেখে বুঝে নেওয়া, ভুল হলে ক্ষমা করা এবং মানুষের ব্যাপারে সম্ভব হলে ভালো ধারণা রাখা। এভাবেই অন্তর পবিত্র থাকবে, সম্পর্ক অটুট থাকবে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক আস্থা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়