২৬/০৪/২০২৬, ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    বিনম্র শ্রদ্ধা আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

    বেগম খালেদা জিয়া

    অবশেষে মহান রাব্বুল আলামিন তার প্রিয়ভাজন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার কাছে নিয়ে গেলেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।পৃথিবীর সকল প্রাণীকে এই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। সেখানে রাজা-বাদশাহ, প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী, নেতা -নেত্রী,জয়ী-পরাজিত—সবাইকে সে নিজের বুকে টেনে নেয়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা মহাকালের গর্ভে গিয়েও হারিয়ে যান না; বরং সময়ের বুকে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক মহান প্রাণ—যিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন, বরং একটি যুগ, একটি সংগ্রাম, একটি প্রতিরোধের প্রতীক। সবার কাছে তিনিও হয়ে উঠেন ঐক্যের প্রতীক। দল মত নির্বিশেষে সকল কিছু ঊর্ধ্বে আজ একটি নাম উচ্চারিত হয় বেগম খালেদা জিয়া। আজ তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান হলো।

    বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেননি ক্ষমতার লোভে। তিনি রাজনীতিতে এসেছেন ইতিহাসের ডাকে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর এক শোকাহত স্ত্রী থেকে তিনি ধীরে ধীরে পরিণত হন আপসহীন নেত্রীতে। স্বামী হারানোর বেদনা তাঁকে দুর্বল করেনি; বরং ইস্পাতকঠিন করে তুলেছে। সেই বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছে এক সংগ্রামী নারীর—যিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছিলেন।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ছিলেন এক ব্যতিক্রম। পুরুষশাসিত রাজনীতির ভিড়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন দৃঢ় কণ্ঠে, স্পষ্ট অবস্থানে। তিনি ছিলেন আপসহীন—ক্ষমতার সঙ্গে নয়, অন্যায়ের সঙ্গে নয়। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেই আন্দোলন কেবল সরকার পতনের নয়, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন ছিল। আর সেই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন খালেদা জিয়া।

    ১৯৯১ সালে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন বাংলাদেশ নতুন করে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে। সংসদ, বিচার বিভাগ, প্রশাসন—সবখানে গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর রাজনৈতিক উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত। ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরাই যেখানে রাজনীতির নিয়ম, সেখানে তিনি ক্ষমতা ছেড়েছেন দেশের স্বার্থে।

    ২০০১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে তিনি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি—এসব অর্জনের পেছনে তাঁর সরকারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে তিনি তুলে ধরেছিলেন মর্যাদার সঙ্গে। মুসলিম বিশ্ব থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য বিশ্ব—সবখানেই তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

    কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। যাঁরা গণতন্ত্রের জন্য লড়েন, তাঁদের জীবন সহজ হয় না। ২০০৭ সালের পর থেকে খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে আসে এক অন্ধকার অধ্যায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তিনি বন্দি হন, অসুস্থ শরীর নিয়ে কাটাতে হয় কারাগারের নির্জন দিন। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, একজন প্রবীণ নারী—তাঁর প্রতি যে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, তা সভ্য সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

    আজ খালেদা জিয়া এই মুহূর্ত থেকে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি আর আমাদের মাঝে ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর আদর্শ এখনো শক্ত যাও অগণিত নেতা কর্মীর হৃদয়ের স্পন্দন হিসেবে জাগরণ থাকবে। তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে আশার আলো জ্বলে ওঠে। কারণ তিনি কেবল একজন ব্যক্তি কিংবা একজন জননী নন—তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক, প্রতিরোধের ভাষা, আপসহীনতার নাম।

    আজকে উচ্চকণ্ঠে বলতে হয় মহাকালের বিচারে খালেদা জিয়া হেরে যাননি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও মহিমান্বিত হয়েছেন। যারা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, ইতিহাস তাদের বিচার করেছে। আর খালেদা জিয়ার নাম লেখা হল কোটি মানুষের হৃদয়। কোন খোদাই করা পাথরে নয়। তার নাম লেখা থাকবে একজন সাহসী নারীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে—যিনি ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে নীতির পথে হেঁটেছেন।বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব মানেই শুধু খালেদা জিয়া। তিনি প্রমাণ করেছেন—নারী দুর্বল নয়, নেতৃত্বের জন্য পুরুষের বিকল্প নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। তাঁর সংগ্রাম আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

    আজ থেকে খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে থাকবেন না। কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর ত্যাগ, তাঁর সংগ্রাম—সেগুলো থাকবে। মহাকালের গর্ভে তিনি হবেন এক অমর নাম। ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করবে গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে, একজন আপসহীন নেত্রী হিসেবে, একজন মহান প্রাণ হিসেবে।খালেদা জিয়া মানে শুধু রাজনীতি নয়—খালেদা জিয়া মানে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ লড়াই। আর সেই লড়াই কখনো পরাজিত হয় না।

    আমিরুল ইসলাম কাগজী

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়