জেড নিউজ, ঢাকা:
ডা: রুখমাবাঈ,ভারতে প্রথম বিয়ে বিচ্ছেদকারি নারী
ডা. রুখমাবাঈ ভারতের দ্বিতীয় নারী চিকিৎসক এবং প্রথম বিয়ে বিচ্ছেদকারি নারী। মাত্র দু বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে তিনি হয়ে পড়েন এতিম। ওদিকে মা জয়ন্তী বাঈ দ্বিতীয়বার বিয়ের করেন তৎকালীন বোম্বের বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজ সংস্কারক সখারাম অর্জুনকে। সেই পরিবারে যাওয়ার পর ১১বছরের মাথায় রুখমার বিয়ে হয় সৎ বাবার ভাতিজা ভিকাজি দামোদরের সঙ্গে। কিন্তু সে ছিল বড় অলস এবং অসৎ। তাই তার পরিবারের না যেয়ে তিনি লেখাপড়া করতে থাকেন এবং দামোদরের কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেন।এ কারণে তাকে ভারতীয় নারী স্বাধীনতার পথিকৃৎ ও বিবাহবিচ্ছেদ আইনে প্রথম হিন্দু মহিলা বলে গণ্য করা যহয়। তবে মামলায় তাকে নির্ভেজাল বিজয়ী বলা যাবে না। কেননা তৎকালীন ভারতীয় সমাজে কোন নারীর পক্ষে স্বামীর কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ নেওয়ার আইন ছিল না। সে কারণে ডাক্তার রুখমাবাঈকে ২০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে স্বামী দামোদরের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে হয়। তবে সে সময় তিনি ডাক্তার হয়ে ওঠেননি ।
ভারতের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে ডা. রুখমাবাঈয়ের নাম অগ্রগণ্য। উনিশ শতকের শেষভাগে যখন নারীর স্বাধীনতা, বৈবাহিক অধিকার, শিক্ষালাভ বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রশ্নগুলো সমাজে প্রায় অব্যক্ত ছিল, তখন রুখমাবাঈ একটি যুগান্তকারী সংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতের আইন ও সমাজ—উভয় ক্ষেত্রেই আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন; তিনি ছিলেন সেই প্রথম হিন্দু নারী, যিনি আদালতের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ ও বৈবাহিক জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিচারের জয় অর্জন করেন। আধুনিক ভারতের বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত নারীর অধিকারের লড়াইয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন তিনি।
শৈশব ও বাল্যবিবাহ: সংঘাতের প্রথম বীজ
রুখমাবাই জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৪ সালে, বোম্বাইয়ে। তাঁর মা জয়ন্তীবাঈ নিজেও ছিলেন এক সাহসী নারী; বিধবা হয়ে স্বাবলম্বী জীবনের জন্য তিনি একজন সমাজসংস্কারকের সঙ্গে পুনর্বিবাহ করেন—যা সে সময়ের সমাজে বিপ্লবের সমান।
মাত্র ১১ বছর বয়সে রুখমাবাইয়ের বাল্যবিবাহ হয় দামোদর পণ্ডিত নামের এক যুবকের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পরও রুখমাবাঈ কখনো স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে রাজি হননি—কারণ স্বামী ছিলেন বেকার, অসৎ ও নির্যাতনকারী। তিনি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং শিক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।
রুখমাবাই বনাম দামোদর পণ্ডিত: একটি ঐতিহাসিক মামলা
১৮৮৪ সালে দামোদর যখন আদালতে আবেদন করেন যেন স্ত্রী রুখমাবাই তাকে ‘দাম্পত্য অধিকার’ (Restitution of Conjugal Rights) দিতে বাধ্য হন—তখন শুরু হয় ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বিবাহসংক্রান্ত মামলা।
রুখমাবাইয়ের সাহসী অবস্থান
তিনি আদালতে স্পষ্টভাবে বলেন—
“আমি কখনোই এমন ব্যক্তির সঙ্গে সংসার করব না, যাকে আমি স্বেচ্ছায় স্বামী হিসেবে গ্রহণ করিনি।”
তার যুক্তিগুলো ছিল—
১.বাল্যবিবাহ তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল; তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।২.দাম্পত্য জোরজবরদস্তি মানবাধিকারের পরিপন্থী।
৩.একজন নারী তার শরীর ও ইচ্ছার ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব রাখে।
এই বক্তব্যগুলো ১৮৮০–৮৫ সালের ভারতীয় সমাজে ছিল অভূতপূর্ব ও রীতিমতো বিপ্লবাত্মক।
আদালতের রায় ও সামাজিক আলোড়ন:
প্রাথমিকভাবে আদালত দামোদরের পক্ষে রায় দেয় এবং রুখমাবাঈকে স্বামীর কাছে ফিরে যেতে অথবা ৬ মাসের কারাবরণ করতে নির্দেশ দেয়। রুখমাবাঈ তখন বলেছিলেন স্বামীর সঙ্গে থাকার চেয়ে ছয় মাস কারাবরণ করাই ভালো। কিন্তু সেটা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।সংবাদপত্রের লেখালেখি এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের চাপের ফলে শেষ পর্যন্ত রুখমাবাঈকে জোর করে স্বামীর কাছে পাঠানোর নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়।
মামলা শেষ হয় একটি সমঝোতার মাধ্যমে—কথিত আছে রানী ভিক্টোরিয়া এই মামলায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন যদিও নথিপত্রে তার কোন সাক্ষ্য প্রমাণ নেই। তার নির্দেশেই মামলাটি সমঝত হয়।রুখমাবাঈ দামোদরকে সেই সময় ২০০০ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেন এবং বিনিময়ে তিনি বিবাহিত সম্পর্ক থেকে মুক্তি পান।
যদিও ব্রিটিশ আইনে ‘হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদ’ তখনো বৈধ ছিল না, রুখমাবাঈ ছিলেন প্রথম হিন্দু নারী যিনি আইনকে ব্যবহার করে বাল্যবিবাহ ও দাম্পত্য জুলুম থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেন।
এই ঘটনার পর ১৮৯১ সালে Age of Consent Act পাস হয়, যা রুখমাবাঈয়ের সংগ্রামেরই একটি সরাসরি প্রভাব।
চিকিৎসা পেশায় দ্বিতীয় নারী রুখমাবাঈ:
সংগ্রামের পর রুখমাবাই ইংল্যান্ডে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন—যা সে সময় ভারতীয় নারীর ক্ষেত্রে বিরল ঘটনা ছিল। তিনি একজন যোগ্য ডাক্তার হয়ে ফিরে আসেন এবং রাজস্থানে নারী চিকিৎসা সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি লিখেছেন বহু মানবিক ও সমাজসংস্কারমূলক প্রবন্ধ—যেখানে নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
হিন্দু বিবাহ আইনে রুখমাবাঈ ছিলেন পথিকৃৎ।
তাঁর মামলাই আইনগত বিতর্কক চরমে তুলেছিল, যা পরবর্তী হিন্দু Marriage Act-এর ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক হয়।
নারীর সম্মতি ও শরীরের স্বাধীনতা নিয়ে প্রথম বড় আইনি লড়াই।
বাল্যবিবাহ ও দাম্পত্য জুলুমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের সূচনা হয় তার হাত ধরে।
তার সাহসী বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে তোলেন।তিনি সংবাদপত্রে ইন্ডিয়ান লেডি ছদ্মনামে লেখালেখি করতেন এবং নারীর অধিকার নিয়ে সারা দেশে বিতর্ক ছড়িয়েছিলেন।
তিনি প্রথম সারির নারী চিকিৎসকদের একজন। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় নারী চিকিৎসক যিনি লন্ডন থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিগ্রী অর্জন করেন।
তাঁর জীবন প্রমাণ করে—শিক্ষা একজন নারীর জীবনে স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
ডা. রুখমাবাঈ ছিলেন স্বাধীনচেতা, দুর্দমনীয় সাহসের প্রতীক। তিনি শুধু একটি মামলায় জয়ী হননি—জিতেছিলেন ভারতীয় নারীর ভবিষ্যৎ। সমাজের নিপীড়ন, বাল্যবিবাহ, দাম্পত্য জুলুম আর অন্ধরীতির বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই প্রমাণ করে—একজন নারী সত্যের পক্ষে দাঁড়ালে ইতিহাস বদলে যায়।
ভারতের নারী অধিকার আন্দোলন, হিন্দু বিবাহ আইন, শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই রুখমাবাঈ রেখে গেছেন অমোচনীয় ছাপ।
তিনি ইতিহাসের সেই আলোকবর্তিকা, যিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—
“সম্মতি ছাড়া কোনো সম্পর্কই পবিত্র নয়, আর শিক্ষা-সাহসই নারীর স্বাধীনতার প্রথম শর্ত।



