আমিরুল ইসলাম কাগজী
সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সারা দেশে এবার ৩৩ হাজার ৩শ’৫৫টি পূজা মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছিল। প্রায় প্রত্যেকটি পূজা মন্ডপে ছিল উৎসব মুখর পরিবেশ। পূজা প্রাঙ্গণে মেলার আয়োজন করা, মেলার আনুষঙ্গিক বিষয় নাগরদোলা, যাত্রাপালা, গান বাজনা কীর্তন সবই হয়েছে। কোথাও কোথাও নৌকা বাইচ, ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন দেখা গেছে। অথচ এই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য দেশের ভেতরে এবং বাইরে থেকে চেষ্টা চালানো হয়। সেই চেষ্টার প্রাথমিক মহড়া দেওয়া হয় খাগড়াছড়িতে।
একটি ধর্ষণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ পুরো খাগড়াছড়ি জুড়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনীকে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছিল। মারা গিয়েছিল তিন তিনটি যুবক। এই তিন যুবক ছিল তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের হারিয়ে তিন তিনটি পরিবার একেবারেই অসহায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই মৃত্যু তিন পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তারপরও সরকার তাদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
যাদের দোকানপাট পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাড়িঘর জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদেরও পুনর্বাসন করার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। ওই ঘটনা ছিল বাংলাদেশকে অশান্ত করে তোলার একটি ঘৃণ্য চেষ্টা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, ভারতের সমর্থনেই খাগড়াছড়িতে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এটা কেবল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কথা নয় বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ বিশ্বাস করে ভারতের কলকাঠি নাড়ানো ছাড়া এমন ঘটনা ঘটতে পারে না । বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় চর হিসাবে খ্যাত এবং বিগত ফ্যাসিবাদের দোসর রায় একের পর এক ষড়যন্ত্র করে চলেছে।
ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু পাহাড অশান্ত করে থেমে থাকেনি। মুসলমানদের সেন্টিমেন্টে আঘাত দেওয়ার জন্য অসুরের মুখে দাড়ি এমন ভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল দেখলেই মনে হবে সম্রাট শাহজাহান। এমন মণ্ডপের সংখ্যা ২৭০ টির মতো। ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য ছিল অসুরের এই মূর্তি দেখার পর মুসলমানরা হয়তো মন্ডপে হামলা চালাবে। কিন্তু আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পূজা উদযাপন ফ্রন্ট এর সময় মত হস্তক্ষেপের কারণে ষড়যন্ত্র বেশি দূর এগোতে পারেনি।
ওই মূর্তিগুলো লাল কাপড় দিয়ে এমন ভাবে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল যে অসুরের বীভৎস গোঁফই কেবল চোখে পড়েছে। দেবী দুর্গার প্রধান লক্ষ্য ছিল অসুরকে বধ করা। আর সেই অসুর যদি হয় সম্রাট শাহজাহান তাহলে মুসলমানরা উত্তেজিত হবেন এটাই স্বাভাবিক। এমন কূচিন্তা কেবলমাত্র পেশাদার ষড়যন্ত্রকারীদের মাথা থেকেই আসতে পারে। যাহোক সবকিছু উতরিয়ে দুর্গাপূজা সম্পূর্ণ হয়েছে। এজন্য সরকারকে সাধুবাদ।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দেশ যেখানে একই উঠানে মসজিদ এবং মন্দির অবস্থিত। নামাজের সময় মসজিদে আজান হয় আবার মন্দিরে পূজার সময় পূজা হয়। নামাজের সময় পূজা বন্ধ থাকে আবার পূজার সময় আজান হয় না। এখানেই শেষ নয় এমন অনেক বাড়ি আছে যেখানে হিন্দু মুসলমানের উঠান ভাগাভাগি করে কাজ করতে হয়। একে অপরের খাবার ভাগাভাগি করে খায়।
এটাই বাংলাদেশের সৌন্দর্য। পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে এমন সম্প্রীতি বজায় রয়েছে। পার্শ্ববর্তী ভারত মুসলমানদের ধর্ম পালনে কেমন বাধার সৃষ্টি করে সেটা তো আমরা কিছুদিন পরপরই দেখতে পাই। উত্তর প্রদেশ গুজরাট এবং দিল্লিতে মুসলমানদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার সময়ও পুলিশ কিভাবে বাধা দেয় সেটা আমরা দেখেছি। একজন মুসলমানের ফ্রিজে মাংস থাকলে সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই গো মাংসের ট্যাগ লাগিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।২০০২ সালে গুজরাটে মোদির বিজেপির পান্ডারা কংগ্রেসের একজন মুসলমান সংসদ সদস্যসহ হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করেছিল।
ওই হত্যাকাণ্ডের পর মোদিকে বলা হয়ে থাকে গুজরাটের কসাই। এমন ঘটনার কি কোন সামান্যতম উদাহরণ বাংলাদেশে দিতে পারবে কেউ?অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের নিচে রাম মন্দির না থাকা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সেই মসজিদ গুড়িয়ে দিয়েছে। সে সময়ও বহু মুসলমানের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অনেককেই করা হয় হত্যা। অতি সম্প্রতি মোগল আমলকে কলঙ্কিত করার জন্য মোদি সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে যেমন মোগল আমলের ইতিহাস মুছে ফেলেছে একইভাবে মোগল স্থাপনাও ভেঙে ফেলচ্ছে। মোগল বাদশাহদের নামে যেসব সড়ক ছিল তাও তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এমন একটি ইসলামবিদ্বেষী সরকার যখন ভারতের সিংহাসনে আসীন তখন তাদের দিয়ে ইসলামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিতে থাকুক এমনটি আশা করা যায় না। সেই মোদি সরকার আস্থা রেখেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার ওপর। গতবছর জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই শেখ হাসিনাকেই আবার মোদি আশ্রয় দিল তার দিল্লিতে। এখনো আশা জিয়ে রেখেছে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের মাটিতে পুনর্বাসিত করবে। তাহলে গত ১৬ বছর যাবত ভারত যে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছে সেটা আবার পুনর্জীবিত হবে। কিন্তু বর্তমান অন্তবর্তী সরকার শেখ হাসিনার বিচার করার কারণে মোদি তেমন একটা আস্থা রাখতে পারছে না। যে কারণে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে না ভারতের।
ভারতের সামনে এখন একটাই টার্গেট-আর সেটা হলো আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। যেভাবেই হোক ভারত চাইবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণ এবং উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত না হোক। এখনো পর্যন্ত যে ধারা অব্যাহত রয়েছে তাতে বলা যায় আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামীলীগ দলগতভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। আর আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতেন না পরে তাহলে ভারত সেই নির্বাচন সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এবারের সনাতন ধর্মের দুর্গা উৎসব সফল করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে যেভাবে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করতে হয়েছে আগামী নির্বাচনকেও সফল করতে হলে এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে এই সরকারের সাফল্য মানুষ যুগ যুগ ধরে মনে রাখবে।





