জেড নিউজ, ঢাকা:
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ অনেকটাই নির্ভর করে তার দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ওপর। জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছর মস্তিষ্কের বৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুত ঘটে। এ সময় প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পেলে শিশুর শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং আচরণগত বিকাশেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের জন্যও শিশুর খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি।
অতিরিক্ত চিনি কেন ক্ষতিকর?
অনেকের ধারণা, বেশি মিষ্টি খেলে শিশু বেশি বুদ্ধিমান হয়। বাস্তবে এ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মস্তিষ্কের প্রধান জ্বালানি গ্লুকোজ হলেও, সেই গ্লুকোজ শরীর স্বাভাবিক খাবার থেকেই পেয়ে থাকে। অতিরিক্ত চিনি বা চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ করলে শিশুর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত ওঠানামা করে, যা তাকে অস্থির, চঞ্চল ও খিটখিটে করে তুলতে পারে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চিনিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে-
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও চিনিযুক্ত খাবার শিশুদের মস্তিষ্কের শেখা ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত অংশের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুর মস্তিষ্কের জন্য যেসব খাবার উপকারী
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার: মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য প্রয়োজন হয় নিউরোট্রান্সমিটার। এই রাসায়নিক পদার্থ তৈরিতে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের উৎস হচ্ছে ডিম, মাছ, মুরগির চর্বিহীন মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডাল, ছোলা, বাদাম।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: ওমেগা-৩, বিশেষ করে ডিএইচএ, শিশুর মস্তিষ্ক ও চোখের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং শেখার সক্ষমতা উন্নত করতে সহায়ক। এই পুষ্টি মিলবে সামুদ্রিক তৈলাক্ত মাছ (স্যামন, সারডিন, ম্যাকারেল), তিসির বীজ, চিয়া সিড, আখরোট ও কুমড়ার বীজ থেকে।
ফোলেট ও ভিটামিন কে: ফোলেট নতুন কোষ গঠনে এবং ভিটামিন কে স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। এ দুটি পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। পালং শাক, লাল শাক, ব্রকলি, মসুর ডাল, মুগ ডালসহ বিভিন্ন সবুজ শাকসবজিতে রয়েছে ভরপুর ফোলেট ও ভিটামিন কে।
ভিটামিন বি: ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স শরীরে খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে এবং মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে ভূমিকা রাখে। এটি মানসিক ক্লান্তি কমাতেও সহায়ক। কলা, ওটস, লাল চাল, বিভিন্ন শস্য, ডিম, ডাল ও দুধে পাওয়া যায় ভিটামিন বি।
কোলিন: কোলিন স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং মস্তিষ্কের কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান। ডিমের কুসুম, সয়াবিন, চিনাবাদাম, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ব্রকলিতে পর্যাপ্ত কোলিন রয়েছে।
আয়োডিন: থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে আয়োডিন অপরিহার্য। এই হরমোন শিশুর মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়োডিনের ঘাটতি থাকলে শেখার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এজন্য খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, দুধ, দই, ডিম।
জিঙ্ক: জিঙ্ক মস্তিষ্কের কোষের বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও শক্তিশালী করে। ছোলা, কুমড়ার বীজ, লাল মাংস, ডাল, বিভিন্ন শস্য এবং দুগ্ধজাত খাবারে জিঙ্ক রয়েছে।
আয়রন বা লৌহ: আয়রনের অভাবে শিশুদের মনোযোগ কমে যেতে পারে এবং শেখার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। তাই বাড়ন্ত বয়সে পর্যাপ্ত আয়রন নিশ্চিত করা জরুরি। কলিজা, লাল মাংস, পালং শাক, ডাল, কিশমিশ ও আয়রনসমৃদ্ধ সিরিয়ালে প্রচুর আয়রন ও লৌহ পাওয়া যায়।
ফল ও রঙিন সবজি: বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের হাত থেকে সুরক্ষা দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। এজন্য খেতে পারেন ব্লুবেরি, কমলা, পেয়ারা, আম, গাজর, টমেটো, বিট ও ক্যাপসিকাম।
অভিভাবকদের জন্য কিছু পরামর্শ
প্রতিদিন শিশুর খাবারে প্রোটিন, শাকসবজি, ফল ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখুন।
কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, চিপস, ক্যান্ডি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব সীমিত করুন।
শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করতে উৎসাহিত করুন।
নিয়মিত শারীরিক খেলাধুলা এবং পর্যাপ্ত ঘুমও মস্তিষ্কের বিকাশে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো ভিটামিন বা মিনারেল সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার আগে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
গরমে নবজাতকের যত্ন নেবেন যেভাবে
শিশুর মেধা ও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর কোনো জাদুকরী খাবার নেই। তবে সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং মানসিকভাবে ইতিবাচক পরিবেশ-এই চারটি বিষয় একসঙ্গে শিশুর মস্তিষ্কের সর্বোত্তম বিকাশে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে শিশুর সুস্থ ও মেধাবী ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।





