জেড নিউজ ডেস্ক :
প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কল্পনার জগৎ অনেক সময় বাস্তবতাকেও ছাপিয়ে যায়। তবে ব্রিটিশ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ড্যান থমসন যে দাবি করেছেন, তা প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সীমারেখাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ঠিক এক বছর আগে এশিয়ার একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইচালিত ‘দেশ’ গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি। সম্প্রতি থমসন দাবি করেছেন, হাজার হাজার মানুষ তার এ পরীক্ষামূলক দেশের নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তার ভাষায়, এটি কেবল প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়; বরং ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থার পরীক্ষাগার। তবে পুরো বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ভালো কিছু বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে তিনি নিজেই পুরোপুরি নিশ্চিত নন।
২০২৫ সালে ফিলিপাইনের পালাওয়ান প্রদেশে একটি দ্বীপের মালিকানা পাওয়ার দাবি করেন থমসন। নিজের এআই কোম্পানি ‘সেনসে’র নামানুসারে দ্বীপটির নাম রাখেন ‘সেনসে আইল্যান্ড’। এরপর এটিকে একটি মাইক্রোনেশন বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রটি পরিচালনার জন্য তিনি ইতিহাসখ্যাত কয়েকজন নেতার আদলে তৈরি এআই বট বা রোবটের সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল গঠন করেন। এ কাউন্সিলে আছেন উইনস্টন চার্চিল, এলিনর রুজভেল্ট, মার্কাস অরেলিয়াস, নেলসন ম্যান্ডেলা, সান জু, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন ও মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। এর পরপরই তিনি সেখানে বসবাসের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ শুরু করেন।
তার এ এআই ‘ক্যাবিনেট’ নীতি প্রণয়ন করবে, বিতর্ক করবে, ভোট দেবে—আর মানুষের কাজ হবে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। থমসনের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ১২ হাজার মানুষ ‘ই-রেসিডেন্ট’ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও বর্তমানে দ্বীপে স্থায়ীভাবে বাস করেন মাত্র একজন পরিচর্যাকারী।
স্বঘোষিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ডের উপকূলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি পরিত্যক্ত নৌ-প্ল্যাটফর্মে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘প্রিন্সিপালিটি অব সিল্যান্ড’। তাদের নিজস্ব রাজপরিবার, পাসপোর্ট এবং একটি আমেরিকান ফুটবল দলও রয়েছে। আবার লিথুয়ানিয়ার ভিলনিয়াসের লিবারেল ‘রিপাবলিক অব উজুপিস’ কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার মরুভূমিতে অবস্থিত ‘স্লোজামাস্তানে’র মতো অনেক ক্ষুদ্র রাষ্ট্র এখন পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তবে থমসনের স্বপ্ন অন্যরকম। তিনি চান, পালাওয়ান প্রদেশের বিখ্যাত স্কুবা-ডাইভিং ও দ্বীপভ্রমণকারী পর্যটকদের জন্য এটি যেন বিকল্প স্টপ বা আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে এখানে স্থায়ী কিছু বাসিন্দা থাকার সম্ভাবনাও দেখছেন। থমসন জানান, দ্বীপের লিজ বা ইজারা এবং উন্নয়নের অধিকার তার রয়েছে, যদিও এ সংক্রান্ত নথিপত্র দেখানোর অনুরোধে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে থমসন বলেন, মানুষের সরকার যেখানে লবিস্ট, ব্যক্তিস্বার্থ ও দুর্নীতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, সেখানে এআই হতে পারে ‘নিরপেক্ষ’ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। এখানে ব্যক্তিগত লাভ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই; কেবল যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত থাকবে।
সেনসে আইল্যান্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এআই চরিত্রগুলোকে ইতিহাসের বাস্তব ব্যক্তিত্বের লেখনী, বক্তৃতা ও নথি দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ফলে ‘এআই চার্চিল’ প্রশ্নের উত্তর দেয় চার্চিলীয় ভঙ্গিতে, যদিও তার মধ্যে বাস্তব চার্চিলের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা অভ্যাস যুক্ত করা হয়নি।
কিন্তু সমালোচকেরা বিষয়টিকে এতো সরলভাবে দেখছেন না। ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের ইনস্টিটিউট ফর এথিক্স ইন এআই–এর ফেলো অ্যালোন্ড্রা নেলসন একে ‘হাস্যকর দাবি’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে এআই ভুল করছে, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে কিংবা মানুষের ক্ষতি করছে। সেখানে একটি কোম্পানি বা একজন উদ্যোক্তার নিয়ন্ত্রিত এআই সরকারকে গণতান্ত্রিক বলা কঠিন।
এ ধরনের প্রশিক্ষিত এআই আদৌ কতটা নিরপেক্ষ হবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ ইতিহাসের অনেক নেতাই ছিলেন উপনিবেশবাদী, যুদ্ধপ্রবণ কিংবা কর্তৃত্ববাদী। এক্ষেত্রে থমসনের দাবি, প্রয়োজনে নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে এআই ‘মন্ত্রী’ পরিবর্তন করতে পারবেন।
সেনসে আইল্যান্ড এখনো বাস্তব রাষ্ট্র নয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই, পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামোও গড়ে ওঠেনি। তবু প্রকল্পটি প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন বহু মানুষ প্রচলিত রাজনীতির ওপর আস্থা হারিয়ে প্রযুক্তিকে বিকল্প সমাধান হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
এদিকে জনমানবহীন এ দ্বীপের নতুন শাসনব্যবস্থা নিয়ে পালাওয়ান সরকারের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।



