জেড নিউজ ডেস্ক :
আধুনিক ফ্রিজ বা বিদ্যুৎ ছাড়াই কীভাবে মাসের পর মাস ফলমূল তাজা রাখা সম্ভব? সেই প্রশ্নের উত্তর বহু আগেই খুঁজে পেয়েছিল আফগানিস্তানের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মাটি ও খড় দিয়ে তৈরি এক বিশেষ সংরক্ষণ পদ্ধতি, যার নাম ‘কাংগিনা’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত একটি প্রাকৃতিক “কুলিং ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি”, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই আঙুরসহ বিভিন্ন ফল দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে সক্ষম। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাংগিনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নতুন করে আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রযুক্তি নিয়ে।
কাংগিনা দেখতে অনেকটা গোলাকার মাটির পাত্রের মতো। এটি তৈরি করা হয় কাদামাটি, খড় ও পানি মিশিয়ে। প্রথমে দুটি বাটি আকৃতির খোল তৈরি করে রোদে শুকানো হয়। এরপর এর ভেতরে সতর্কভাবে আঙুর বা অন্যান্য ফল রাখা হয়। পরে আরেক স্তর কাদা দিয়ে মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে ভেতরে বাতাস খুব সীমিতভাবে প্রবেশ করতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত মোটা খোসার আঙুর যেমন তাইফি বা কিশমিশি জাতের আঙুর এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে ভালো সংরক্ষণ করা যায়। উপযুক্ত ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে রাখলে ফল প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত সতেজ থাকে।
গবেষকদের মতে, কাংগিনা আসলে “প্যাসিভ কন্ট্রোলড অ্যাটমোসফিয়ার স্টোরেজ” হিসেবে কাজ করে। মাটির স্তর ফলের চারপাশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যায় এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে ফলের বিপাকক্রিয়া ধীর হয় এবং ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমে যায়।
এ ছাড়া মাটির পাত্র অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে নেয়, ফলে ফল সহজে পচে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি আধুনিক প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, আফগানিস্তানে হাজার বছর ধরে আঙুর চাষ হয়ে আসছে। ধারণা করা হয়, কাংগিনা পদ্ধতির বয়সও কয়েক শ বছর থেকে হাজার বছরের বেশি। এমনকি দ্বাদশ শতাব্দীর কৃষিবিষয়ক লেখাতেও মাটি ও খড় ব্যবহার করে ফল সংরক্ষণের উল্লেখ পাওয়া যায়।
আফগানিস্তানের দুর্গম গ্রামগুলোতে, যেখানে বিদ্যুৎ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা সহজলভ্য নয়, সেখানে আজও কাংগিনা মানুষের খাদ্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শীতকালে টাটকা আঙুর খাওয়ার জন্য অনেক পরিবার গ্রীষ্ম বা শরৎ মৌসুমেই কাংগিনা তৈরি করে রাখে।
বিশ্বজুড়ে যখন বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, তখন কাংগিনা নতুন করে গবেষকদের নজর কাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশের বিদ্যুৎবিহীন অঞ্চলে এই ধরনের প্রাচীন প্রযুক্তি খাদ্য অপচয় কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই এই পদ্ধতিকে “প্রাকৃতিক ফ্রিজ” বা “প্রাচীন জিপলক প্রযুক্তি” বলে আখ্যা দিয়েছেন। আফগান জনগণের এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এখন বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।



