জেড নিউজ ডেস্ক :
দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ বা দ্রুত পরিবর্তনশীল পোশাক সংস্কৃতি। সস্তায় হালনাগাদ ডিজাইনের পোশাক গ্রাহকের হাতে তুলে দিতে গিয়ে শিল্পটি এখন পরিবেশের জন্য অন্যতম বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ১০ শতাংশের জন্য দায়ী এ খাত, যা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও নৌ-পরিবহন খাতের সম্মিলিত নিঃসরণের চেয়েও বেশি। এছাড়া পানির অপচয় ও দূষণেও এ শিল্পের অবস্থান দ্বিতীয়।
ফাস্ট ফ্যাশন মডেল মূলত কম খরচে দ্রুত উৎপাদন এবং বিপণনের ওপর ভিত্তি করে চলে। নব্বইয়ের দশকে স্প্যানিশ ব্র্যান্ড ‘জারা’র মাধ্যমে এ ধারার শুরু। বর্তমানে জারা, এইচঅ্যান্ডএম, শিন ও ইউনিক্লোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজাইনের ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য দোকানে নিয়ে আসছে। এ অতি-উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়ছে তা আঁতকে ওঠার মতো।
বিজনেস ইনসাইডারের তথ্যমতে, একটি সুতির শার্ট তৈরিতে প্রায় ৭০০ গ্যালন ও এক জোড়া জিন্স তৈরিতে প্রায় ২ হাজার গ্যালন পানির প্রয়োজন হয়। টেক্সটাইল ডাইং বা রং করার প্রক্রিয়াটি বিশ্বের পানি দূষণের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। আর বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের ১০ শতাংশের জন্য দায়ী পোশাক শিল্প। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৬০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ।
সেইসঙ্গে প্রতি বছর ধোয়ার সময় সিন্থেটিক কাপড় থেকে প্রায় ৫ লাখ টন মাইক্রোফাইবার সাগরে মিশছে, যা ৫০ কোটি প্লাস্টিক বোতলের সমান। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন পোশাক ও টেক্সটাইল সামগ্রী বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এছাড়া উৎপাদিত পোশাকের ৮৫ শতাংশই শেষ পর্যন্ত ভাগাড়ে জমা হয়। সস্তা ও ক্ষণস্থায়ী ফ্যাশন পণ্যের এ বিশাল স্তূপ এখন বৈশ্বিক পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফাস্ট ফ্যাশন শুধু পরিবেশ নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সামাজিক ঝুঁকিও তৈরি করছে। চিপ লেবার বা সস্তা শ্রমের সন্ধানে অনেক ব্র্যান্ড এমন সব দেশে কারখানা স্থাপন করে যেখানে শ্রম আইন শিথিল। এর নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে উঠে এসেছে শিশুশ্রম ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি এ শিল্পের অন্ধকার দিকটি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছিল।
ফাস্ট ফ্যাশনের বিপরীতে এখন ‘স্লো ফ্যাশন’ বা টেকসই ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ব্যবহারের চেয়ে বেশি কেনার প্রবণতা কমাতে হবে। টেকসই উদ্যোগ হিসেবে থ্রেডআপ বা পশমার্কের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো পুরনো পোশাক কেনাবেচায় উৎসাহ দিচ্ছে। সেইসঙ্গে রেন্ট দ্য রানওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য পোশাক ভাড়ার সুযোগ দিচ্ছে।
তবে পরিবশে দূষণ ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় অর্গানিক কটন, লিনেন ও পাটের মতো পরিবেশবান্ধব তন্তু ব্যবহার বাড়ানো। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভোগের লাগাম না টানলে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে এ দূষণ ঠেকানো সম্ভব নয়। ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির ফ্যাশন মার্কেটিংয়ের সিনিয়র লেকচারার প্যাটসি পেরি বলেন, ‘লেস ইজ অলওয়েজ মোর’—অর্থাৎ কম কেনাই পরিবেশ রক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়।



