১২/০৬/২০২৬, ০:১৪ পূর্বাহ্ণ
    spot_img

    এ সপ্তাহের সেরা

    সম্পর্কিত পোস্ট

    দুই সিটিতে ডেঙ্গু মোকাবিলা: কর্তৃপক্ষের নজর জনসচেতনতায়

    জেড নিউজ, ঢাকা:

    দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছুদিন ধরে চলছে এই বৃষ্টি এই রোদ। পথঘাটসহ নানা জায়গায় জমে থাকছে পানি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমন পরিবেশই ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশা বিস্তারের জন্য আদর্শ। এদিকে বর্ষপঞ্জির হিসাবে দিন তিনেক পরই বর্ষাকাল শুরু। এডিস মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ আরও অনুকূল হবে তখন।

    স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, ইতিমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। কিন্তু এমন প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সাময়িক ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ ও সচেতনতা তৈরি ছাড়া বিশেষ সমন্বিত উদ্যোগ নেই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের।

    কোরবানি ঈদের বর্জ্য ও টানা বৃষ্টিপাতের কারণে সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশেই মশার উপদ্রব বেড়েছে বলে অভিযোগ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের। রাজধানীর মুগদাপাড়ার বাসিন্দা সিরাজুল আলম জানান, স্থানীয় খালে দূষণ, যেখানে-সেখানে ময়লার কারণে মশা বাড়ছে। সন্ধ্যার পর এলাকায় মশার জন্য কোথাও বসাই যায় না।

    বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্ময় রায় বলেন, ‘আমার বাসা ১০ তলার ওপরে। তা-ও ঘরে সন্ধ্যার পর থেকে মশা আসতেই থাকে। সমানে মারি, তবু শেষ হয় না।’

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগেই পূর্বাভাসে দেখা গিয়েছিল, ঈদের পর থেকে এডিস মশার প্রকোপ বাড়তে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্ষা মৌসুম এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে অনুকূল সময়। বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে। তাই বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

    ঈদে দীর্ঘ ছুটি থাকার কারণে অনেক স্থানে জমে থাকা পানির উৎসগুলো নিয়মিত তদারকি করা হয়নি উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, পাশাপাশি বৃষ্টি বৃদ্ধি পাওয়ায় এডিসের প্রজননও বেড়েছে। তাঁর মতে, ঈদের আগের তুলনায় বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপ সম্ভবত প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

    মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে অ্যাডাল্টিসাইড (পূর্ণবয়স্ক মশা মারার ওষুধ) খুব বেশি কার্যকর নয় জানিয়ে কবিরুল বাশার মশা দমন কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে কীটনাশকের ধরন বা ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন। আগামী দিনগুলোয় ডেঙ্গু যদি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়তে পারে বলে সাবধান করে দেন তিনি।

    স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এবার ডেঙ্গু মোকাবিলা সহজ হবে না। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন, এবারের ডেঙ্গুর রূপ হবে ভয়াবহ। মন্ত্রী সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, যেখানেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানেই আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ জরিমানা করা হবে।

    স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৪৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসের ১০ দিনেই সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৪৭ জন। ১ জুনে খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর তথ্যও রেকর্ড করা হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ জনে।

    দুই সিটির পরিস্থিতি:

    ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মে মাসে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এমন কোনো জরিপ নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থার কর্মকর্তারা।

    মশার প্রকোপ বেড়েছে বলে মনে করছেন না ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। তিনি বলেন, ‘গত তিন দিনে কোথাও থেকে মশার প্রকোপ বেড়েছে, এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। আমরা বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে খবর নিয়েছি, সেখানেও রোগীর সংখ্যা বাড়েনি।’

    ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব এলাকাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে বর্তমানে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম বৃহস্পতি ও শুক্রবার পর্যন্ত চলবে। এরপর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

    এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্কুল ও কলেজভিত্তিক কর্মসূচি, বাসাবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমে থাকা পানি অপসারণ, মশকনিধন, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

    অন্যদিকে ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন জানান, ডেঙ্গু মোকাবিলায় তাঁরা ওয়ার্ডভিত্তিক মশকনিধন কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সভা, সেমিনার এবং স্কুল ও কলেজভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়েছেন। এ ছাড়া জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণে নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

    মো. জাকির হোসেন বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী তিন মাস এই কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে সব ওয়ার্ডে পরিচালিত হবে। আগে থেকেই প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছেন দাবি করে ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমাদের প্রস্তুতি ভালো রয়েছে। চলমান কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’

    এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজধানীসহ দেশব্যাপী স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত শনিবার তিন মাসের বিশেষ অভিযান কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে।

    নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত নগরায়ণের পরামর্শ দিচ্ছেন। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘পরিসংখ্যান সামনে ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়বে বলেই তথ্য দিচ্ছে। মশার বিস্তার ও ডেঙ্গুতে মৃত্যুরোধে সমন্বিত নগর-পরিকল্পনা এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা একটি নগর-পরিকল্পনা এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করতে না পারব, ততক্ষণ শুধু কেমিক্যাল দিয়ে ফগিং করে কোনো লাভ হবে না।’

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    জনপ্রিয়