spot_img

এ সপ্তাহের সেরা

সম্পর্কিত পোস্ট

গ্রিন কার্ড পাওয়া কঠিন করতে ট্রাম্পের নতুন বিধির বিরুদ্ধে ২২ অঙ্গরাজ্যের মামলা

জেড নিউজ ডেস্ক:

নিউইয়র্ক— যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যসহ আরও ২১টি অঙ্গরাজ্য ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, নতুন একটি বিধির মাধ্যমে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS)-কে এমন অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড, ভিসা বা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, যাদের সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হবে।

নতুন এই বিধি শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। এর ফলে খাদ্য সহায়তা, মেডিকেড বা সরকারি আবাসন ভাউচারের মতো সরকারি সুবিধা গ্রহণকারী কিংবা ভবিষ্যতে এসব সুবিধার প্রয়োজন হতে পারে—এমন অনেক অভিবাসীর জন্য গ্রিন কার্ড পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি সোমবার সিটি হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এই আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। মামদানি এমন একটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে কয়েকটি শহরও একই ধরনের মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছে।

এই মামলায় ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়াও যুক্ত রয়েছে। মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, নতুন বিধির কারণে বিশেষ করে অভিবাসী ও মার্কিন নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মিশ্র-স্ট্যাটাস’ পরিবারগুলো সরকারি সহায়তা নেওয়া বন্ধ করে দিলে তারা কয়েক বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল অর্থ হারাতে পারে।

‘পাবলিক চার্জ’ বিধি কী?

মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের ‘পাবলিক চার্জ’ (Public Charge) বিধির পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। এই বিধির আওতায় সরকার এমন কোনো ব্যক্তির ভিসা বা গ্রিন কার্ড আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারে, যাকে ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে অভিবাসন কর্মকর্তারা মূলত নগদ সরকারি সহায়তা—যেমন Temporary Assistance for Needy Families (TANF) অথবা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার Supplemental Security Income (SSI)—বিবেচনায় নিতেন।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত নতুন বিধিতে কোন কোন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিবেচনা করা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। ফলে মেডিকেড, খাদ্য সহায়তা এবং সরকারি আবাসন ভাউচারের মতো নগদ নয় এমন সুবিধাও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।

নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এক বিবৃতিতে বলেন, অভিবাসী পরিবারগুলো যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে ভয় না পায়।
তিনি বলেন, কঠোর পরিশ্রমী পরিবারগুলোকে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য করা উচিত নয়—শুধু এই ভয়ে যে সহায়তা চাইলে তাদের অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তার অভিযোগ, নতুন বিধিটি সেই ভয়কে কাজে লাগিয়ে পরিবারগুলোকে খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য আইনসম্মত সরকারি সুবিধা ত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারে।

নতুন বিধিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। অবৈধ অভিবাসীরা সাধারণত এসব সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।
নিউইয়র্কের অভিযোগ। নিউইয়র্কের পক্ষ থেকে করা মামলায় বলা হয়েছে, কংগ্রেস ‘পাবলিক চার্জ’ বলতে কী বোঝায়—তার যে সীমা নির্ধারণ করেছে, DHS তার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলো আরও বলেছে, DHS-এর নতুন সিদ্ধান্তটি ‘arbitrary and capricious’, অর্থাৎ যথাযথ যুক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি।
তাদের অভিযোগ, নতুন বিধির সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবগুলো DHS যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি এবং কেন এই পরিবর্তন প্রয়োজন—তারও পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দেয়নি।
অঙ্গরাজ্যগুলোর মামলাটি সোমবার সকালে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে দায়ের করা হয়েছে।

তবে তারা সরকারের কাছ থেকে কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেনি। তাদের মূল দাবি হলো—আদালত যেন নতুন বিধিটির কার্যকারিতা বন্ধ করে, বিধিটিকে বাতিল ঘোষণা করে এবং DHS-কে এটি প্রয়োগ করা থেকে বিরত রাখে। এ বিষয়ে CNN-এর পক্ষ থেকে DHS-এর মন্তব্য চাওয়া হয়েছে। ‘পাবলিক চার্জ’ বিধির ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের ১৮৮২ সালের Immigration Act-এ ‘পাবলিক চার্জ’ সংক্রান্ত বিধানের সূত্রপাত। সে সময় ফেডারেল আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য ছিল নিশ্চিত করা যে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীরা নিজেদের জীবনযাপন চালাতে সক্ষম হবেন এবং রাষ্ট্রের ওপর বোঝা হয়ে উঠবেন না। বহু বছর ধরে অভিবাসন কর্মকর্তারা মূলত নগদ সরকারি সহায়তাই বিবেচনায় নিতেন।

কিন্তু প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন ২০২০ সালে এই বিধির আওতা বাড়ায়। তখন মেডিকেড, খাদ্য সহায়তা এবং সরকারি আবাসন ভাউচারের মতো বিভিন্ন কর্মসূচিকেও বিবেচনার আওতায় আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন নতুন একটি বিধি প্রকাশ করে এসব নগদ নয় এমন সুবিধাকে আবার ‘পাবলিক চার্জ’ মূল্যায়নের বাইরে রাখে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থার কাছাকাছি ফিরে যাওয়া হয়। এ সপ্তাহে কার্যকর হতে যাওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বিধিটি সেই বাইডেন-যুগের বিধি বাতিল করবে।

নতুন বিধিটি প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২০ সালের বিধির চেয়েও আরও বিস্তৃত। কারণ, এতে কোন কোন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিবেচনা করা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। বরং DHS বলেছে, আবেদনকারী ‘means-tested public benefits’—অর্থাৎ আয় বা আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত সরকারি যেকোনো সুবিধা গ্রহণ করেছেন কি না—তা বিবেচনা করা হবে। পরিবারের সদস্যদের সুবিধাও বিবেচনায় আসতে পারে নতুন বিধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আবেদনকারীর পরিবারের সদস্যদের নামে নেওয়া সরকারি সুবিধাও অভিবাসন কর্মকর্তারা বিবেচনা করতে পারবেন। এর মধ্যে এমন সুবিধাও থাকতে পারে, যা মার্কিন নাগরিক সন্তানদের নামে নেওয়া হয়েছে।

‘Protecting Immigrant Families Coalition’-এর নীতি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক ম্যাডি গেশু CNN-কে এ তথ্য জানিয়েছেন।
বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর শহরগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নতুন বিধির কারণে নিউইয়র্ক সিটির মতো বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠী থাকা শহরগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব শহর সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফেডারেল অর্থের ওপর নির্ভরশীল। মামদানি সোমবার ঘোষণা করতে পারেন যে আরও কয়েকটি স্থানীয় সরকারও নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে মামলা করবে। এসব স্থানীয় সরকারের মধ্যে রয়েছে শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটল, ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারা কাউন্টি এবং ওয়াশিংটনের কিং কাউন্টি।

মামদানি এক বিবৃতিতে বলেন, নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ বিধির উদ্দেশ্য হলো অভিবাসী পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে তাদের খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রয়োজনীয় সরকারি কর্মসূচি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তিনি বলেন, নিউইয়র্কের মানুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে বা আইনগতভাবে প্রাপ্য সহায়তা চাইতে ভয় পেতে পারে। আর এই ভয় শুধু যেসব পরিবারকে ফেডারেল সরকার লক্ষ্য করছে তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি সুবিধা পাওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্য এমন পরিবারগুলোর মধ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর খরচ বহন করতে হবে নিউইয়র্কের সব বাসিন্দাকেই।

ফেডারেল অর্থ হারানোর আশঙ্কা

মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর যুক্তি, নতুন নীতির আর্থিক ক্ষতির বোঝা তাদের ওপরই পড়বে। অভিবাসীরা যদি ভয় পেয়ে বৈধভাবে প্রাপ্য সরকারি সুবিধা নেওয়া বন্ধ করে দেন, তাহলে রাজ্যগুলো ফেডারেল অর্থ হারাতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোকে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
মামলায় বলা হয়েছে, পরিবারগুলো যদি স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা এবং স্কুলের মধ্যাহ্নভোজের মতো বৈধ সুবিধা নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে এর প্রভাব জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় অর্থনীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জননিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। আইনি নথিতে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, রাজ্যটিতে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী বাস করেন এবং রাজ্যটির সরকারি সহায়তা কর্মসূচির পরিধিও বড়। পাশাপাশি নিউইয়র্কে সব শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলের খাবারের কর্মসূচি রয়েছে এবং মেডিকেড ও SNAP কর্মসূচিতে রাজ্যটি উল্লেখযোগ্য ফেডারেল অর্থের ওপর নির্ভরশীল।

মামলায় আরও বলা হয়েছে, দেশজুড়ে রাজ্যগুলো তাদের Medicaid ও CHIP কর্মসূচির জন্য ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে বছরে আনুমানিক ৪.০৫ বিলিয়ন ডলার কম অর্থ পেতে পারে। এর মধ্যে মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতি প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার।

অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্কের আশঙ্কা

অভিবাসী অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, নতুন নীতিটি কয়েক লাখ অভিবাসী পরিবারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে মিশ্র-স্ট্যাটাস পরিবারগুলো—যেখানে পরিবারের কোনো সদস্য অভিবাসী এবং অন্য সদস্য, যেমন সন্তান, মার্কিন নাগরিক—সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অভিবাসন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি নেতিবাচকভাবে বিবেচিত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেক পরিবার হয়তো তারা আইনগতভাবে যে সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে, সেগুলোর জন্য আবেদন করাও বন্ধ করে দিতে পারে।

যে অঙ্গরাজ্যগুলো মামলায় যুক্ত

নিউইয়র্ক ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া ছাড়াও মামলায় অংশ নিয়েছে—
ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়, কলোরাডো, কানেকটিকাট, ডেলাওয়্যার, হাওয়াই, মেইন, মেরিল্যান্ড, ম্যাসাচুসেটস, মিশিগান, মিনেসোটা, নিউ জার্সি, নিউ মেক্সিকো, নেভাদা, ওরেগন, পেনসিলভানিয়া, রোড আইল্যান্ড, ভারমন্ট, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন এবং উইসকনসিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয়